এবং চিলেকোঠা- র বেকার সংখ্যা র গুগল ব্লগের সংস্করণটি পুনরুদ্ধার করা সংস্করণ মাত্র। পুর্বের সংস্করণটি নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়, ২০২১ সালে। ওই ওয়েবসাইটটি মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়ায়, এইখানে প্রকাশিত হল। যারা বা উৎসুক পাঠকগণ পত্রিকার সমন্ধে আগ্রহী , এই সংখ্যার মাধ্যমে পত্রিকার স্বাদ কোরকের ধারণা করতে পারেন একপ্রকার।
প্রচ্ছদ - প্রণবশ্রী হাজরা
উৎসর্গ - যারা এ টি এম মেশিনে রোজ সকালে চেক করেন গেল মাসের বেতন ঢুকলো কিনা !
সম্পাদকীয়
বেকার সংখ্যা কখনোই একটি wholesome হতাশা বা হেরে ও হারিয়ে যাওয়ার কথা বলে না। বেকার শব্দটা আসলে জীবনকে উৎযাপন করার খণ্ডচিত্র মাত্র। আলোর মাহাত্ম্য সেই উপলব্ধি করতে পারেন যিনি সাদা ও কালোকে সূক্ষ্মতর ভাবে চেনেন , ঘোলাটে বা ধূসর বলে মাঝামাঝি আড়াআড়ি কিংবা ত্যারছা কোনো অবস্থানই নেন না। তিনি আলোকে এনজয় করেন।
জীবন এক অনুভূতি, অভিজ্ঞতা এবং উপলব্ধি লব্ধ বিষয়। মানুষ নিজের অজান্তেই নিজের সামনে ঠিক কবে থেকে ঝুলিয়ে ফেলেছে একটি রাজভোগ , এখন আর কেউ জানে না, মনে করতেও পারে না। মানুষ একা এবং একা থাকাটা ,এক নিরীহ ফ্যাশন, আস্তে আস্তে মানুষকে বুঝিয়ে দিয়েছে , কীভাবে মানুষ তার আশপাশের বায়োস্ফেয়ারকে খাটো করবে ! আমাদের অনেকের কাছেই জীবন একটি ইনডোর গেম। এর বাইরে যাবতীয় অপ্রয়োজনীয় বা বেকার দুনিয়া। তাই ব্যালকনিতে ঘুরঘুর করা কাঠবেড়ালি এই বছর আম খেলো কিনা কেউ জানে না। ক’টা খেলার মাঠ পার্থেনিয়াম বাগিচা হল কেউ জানে না। লিটিল ম্যাগাজিনগুলো পেপারলেসের দিকে গড়িয়ে যাচ্ছে, কতো বাঁধাইশিল্পীর পাকস্থলি খালি পেটে অহেতুক জল খাবে জানে না কেউ। ইতিহাস সাহিত্য পড়লে যারা মনে করেন শরীরে আঁশটে গন্ধ ছাড়বে তারা কোনোদিন খুঁজে পায়না গলির সন্ধান। ওরা আজীবন পাকা রাস্তার উপর মরে পড়ে থাকে।
জীবনকে কতদূর পর্যন্ত বাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে , এই এক খেলার নামই বেকার । যেখানে অদ্ভুত এক ধোঁয়া ঢাকা মাঠে যেন অজস্র বিচিত্র ফ্রেমের চশমা, যাতে চোখ রাখলেই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যাচ্ছে। যে কাজ বা পরিস্থিতি বা বিষয় আমাদের সামনে দিনে দিনে প্রকটভাবে জিতে যাচ্ছে প্রতিদিন, সেটা অজান্তে কিছু একটা শেখাতে চায়ছে সেইটা খুঁজে বের করতে শিখে যাওয়াটাই ম্যাজিক বা জীবন। বলা ভালো এতে বেকার কী কেন কীভাবে সব স্পষ্ট হয়ে যাবে। অযৌক্তিক ট্যাবুগুলো একটা ফুঁ দিলেই ভেঙে যাবে। দেশ-কাঁটাতার-ধর্মের নাম দিয়ে রাজনীতি-জাত থেকে সেক্স-বিয়ে-মনোপজ-চাকরি-মোবাইল ফোন কেনা … কোনো কিছুতেই মানুষের স্পষ্ট ধারণা নেই কেন সে করছে। স্রেফ প্রশ্ন করুন , দেখুন জীবনের পরিধি বাড়তে থাকবে বাড়তেই থাকবে আর বেকারত্বকে উপভোগ করতে না পারলে কোনোদিনই জীবনের সন্ধান পাওয়া যায় না। আমাদের সামনের সেই রাজভোগ একদিন শুকিয়ে গেলেই তা জরা ভোগ।
আমরা হয়তো একটা পিনছিদ্র বাক্সের অন্ধকারের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছি। যে ছিদ্র দিয়ে আলো প্রবেশ করছে তা খুঁজে পাচ্ছি না। আমরা যদি নিজের ডাইমেনশন বা দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিই তাহলেই হয়তো উৎস বা গোলাপী দরজার সন্ধান পেয়ে যাব। যেমন আমাদের ঘরের দেওয়ালে ক্ষুদ্রতম ফুটোটি পিপড়েরাই জানে। আমরা দরজা জানলা জানি বড়জোর ছাদ। নিজেকে স্থিতিস্থাপক করতে শেখা এই তো খেলা এই তো বেকার জীবন । প্রত্যাশা শূন্য এক বাঁচা। ভেকহীন ও শুদ্ধ
বেকার আদতে ব্যক্তিগত ধারণা পুষ্ট। আমরা এই সংখ্যায় তাই কয়েকজনের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গিকেই তুলে ধরতে চেয়েছি। আগেও যেমনটা হয়েছে আমরা লেখার প্রচলিত শ্রেণিবিভাজন করিনি এবারেও তা করিনি। পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেদের রক্ষা করার কৌশল অবলম্বন করা আধুনিক সভ্যতায় বুদ্ধিমত্তার লক্ষণ এবং দস্তুর। তবে কখনোই চতুরতার নয়। আমরা তাই ঠিক যেমন ছিলাম কাগজের ওপর তেমনি এবার আমাদের কিছু নির্দিষ্ট ও বিশেষ কাজ থাকবে সাংখ্যিক মাধ্যমে অর্থাৎ ওয়েবসাইটেও। লেখাকে নিয়ে ব্যবসা করার লোভ আসেনি কোনোদিন , কেননা ছলনার দীনতা আমাদের অতি প্রকট। আপনারা শুধু ভালোবাসা নিয়েই আমাদের পাশে এসে দাঁড়ান , আমাদের নতুন প্রচেষ্টায় আপনাদের খুব প্রয়োজন।
সহ-সম্পাদকীয়
সময়টা এমন যেন ঝড়ের মাঝে অন্ধকার হলে গেছে সন্ধে। চারপাশ শোঁ শোঁ... ভাঙা কাচ ও গাছের মৃত্যুনাদ। দীর্ঘ বছর দাঁড়িয়ে থাকার পর বিশ্রামের লোলুপ হাতছানি তাদের নিয়ে যাচ্ছে সুদীর্ঘ নিদ্রায়। বিদ্যুৎপৃষ্ঠ সময় অতীত ও বর্তমানের শরীরে শরীরে অ্যাম্বিগ্রামে লিখে যাচ্ছে " বেকার "।
প্রসেসড্ শ্বেতপাইনের মাথা ঘষতেই মোমবাতিটা জ্বলে উঠল। মোমবাতিটা জ্বালাতে মোটামুটি তিনটে বছর গেছে। গাঢ় অন্ধকারে হাতে মোম নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছি সেই আলমারিটার সামনে। পাল্লা খুলতেই তাকে তাকে সাজানো ' ফর্ম ' - কবিতা, গদ্য, পদ্য, প্রবন্ধ, নিবন্ধ। হাতের মোমের আগুন ধরিয়ে দিচ্ছি এক একটা তাকে। পুড়ে যাচ্ছে অক্ষরসমাজের "বেকার " শ্রেণীবিভাজন । তথাকথিত ফর্ম আমরা চাইনি।
একটা সামুদ্রিক কচ্ছপ ফেলে আসা রাস্তায় সাঁতার শুরু করেছে। কুড়ি বছর আগে যেখানে তার হ্যাচিং হয়েছিল ঠিক সেখানে গিয়েই সে প্রসব করবে তার প্রথম ডিম। বালির ওমে নরমে তার তৈরি ভ্রূণেরা আকার নেবে। সমুদ্রের অথৈয়ের কোনো মানচিত্র, কোনো কার্টোগ্রাফার তাকে দেয়নি। শুধু তার মাথার কিছু রিসেপটর তাকে চিনিয়ে দেয় সেই কুড়ি বছর আগের নির্দিষ্ট ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড।
এটা ছাড়ুন! একটা বা একদল গ্রেট ডাইভিং বিটল। যার শ্বসনপ্রণালীতে কোথাও উভচরের লেশমাত্র নেই। গভীর জলে ঝাঁপ দেয় হঠাৎ। আত্মহত্যা? না, খাবারের সন্ধান। জলে ডুবেও যাতে বেঁচে থাকা যায় তার জন্য এক বিশেষ পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে এরা। ডানার তলায় অক্সিজেন ভরা একটা বুদ্বুদ তৈরি করে এরা ডুব দেয়। যতক্ষণ ডুবে থাকে এই বুদ্বুদ তাদের শ্বসনপ্রক্রিয়া চালায়। বুদ্বুদ ফেটে গেলে মৃত্যু অনিবার্য কিন্তু বেশ কিছুটা অক্সিজেন থাকাকালীন পাখার তলা থেকে জলে বের করে এই বুদ্বুদকে জলের অক্সিজেন দ্বারা রিফিল করে তারা, ঠিক একটা ব্যাটারি রিচার্জ করার মতই। এই মেকানিজম, এই অত্যাশ্চর্য প্রক্রিয়া ঘটায় একটা আরশোলার মত লম্বা বিটল পোকা! এরকম উদাহরণ প্রকৃতিতে অসংখ্য। তবু নাকি মানুষ প্রকৃতির শ্রেষ্ট জীব! আমরা হাসছি - বিদ্রুপ করছি এই ধরণের " বেকার" ধারণাদের। একটা এক্সপ্লোরেশন একটা শব্দকে ঘিরে ।তার অজস্র দিক ও ঘটনা বিশেষে তার অর্থ। ভাবনার এঙ্গেল ঘুরছে।
" বেকার" আসলে একটা সংখ্যামাত্র নয়, একটা টুল - তথাকথিতদের , চলতিদের দুমড়ে দিয়ে যেতে চলেছে।
মণিদীপা সেন
সুচিপত্র
- সম্পাদকীয়- চয়ন দাশ
- সহ সম্পাদকীয়- মণিদীপা সেন
- শ্যাম পুলক ।।
- তৃপ্তি সান্ত্রাঁ।।
- কৌস্তভ কুণ্ডু।।
- শুভঙ্কর ঘটক ।। নীড়িহারচঞ্চু
- অনুপম মুখোপাধ্যায় ।। বেকারত্ব বলতে আমি যেটা বুঝি
- প্রতীক ঘোষ।।
- উমাপদ কর ।। বেকারে-সাকারে বাইরে-ভেতরে
- অহনা সরকার।।
- সন্তোষ চক্রবর্তী।।
- রাহুল গাঙ্গুলী।।
- শানু চৌধুরী।।
- রথীন বণিক।।
- জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়।।
- চয়ন দাশ।।
- ইন্দ্রনীল ঘোষ।।
পত্রিকার ঠিকানা
এবং চিলেকোঠা । এম-৬৬ সাগরভাঙ্গা কলোনি, দুর্গাপুর, পশ্চিম বর্ধমান, পশ্চিমবঙ্গ,ভারতবর্ষ ।পিন- ৭১৩২১১। কথা- ৮৯৪৫৮৩২৮০৬
এক দৈত্যাকার কাউচ
শ্যাম পুলক
সুরিয়ালিস্টদের মতো চিন্তা করা যেতে পারে, কিন্তু ব্যাপারটা বেশ একঘেয়ে লাগে। কিন্তু যখন আপনি স্বপ্ন দেখছেন তেমন কোনো দিনের তা বেশ মনোমুগ্ধকর। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো আমরা তেমন কোন স্বপ্নের সময়েই বাস করছি--সময় স্থির বলা চলে এবং তার একঘেয়েমিটাও ধরতে পারছি। আমাদের একই ধরনের সুন্দর স্মৃতি আছে, একই প্রিয় মানুষ আছে কিন্তু তারপরও সময় ভৌতিক রূপ পাচ্ছে, রূপকথার চিরতরুণ সুখ হয়ে উঠছে না। তারপরও আপনি যখন তেমন কোনো সময়ের স্বপ্ন দেখছেন, যে সময়ে আপনি যাপন করছেন, তার মানে—সময়ের স্থবিরতায় এমন একটা ফোর্স কাজ করছে, যা অনেক দুরের, আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরের। মোটেই আত্মিক না। যা এসে সময়ের ওপর চেপে বসেছে—এবং তা মোটেই আমাদের চাহিদা মানছে না। আমরা যা স্বপ্ন দেখছি সেই সময় আমাদের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে—অনেকটা অসহায়ের মতো— কিন্তু আমরা তাকে আঁকড়ে ধরতে পারছি না। এর একটা কারণ আমরা আমাদের এই অসহায়তায় অভ্যস্ত নই—আমরা এটা কখনই এটা চাইতে পারছি না, যা স্বপ্ন দেখছি তা সত্যই পেয়ে যাবো। অথবা যা কেবল স্বপ্নেই সুন্দর। এজন্য মাঝে মাঝে এখানে হয়তো সুরিয়ালিস্টদের দরকার পড়ে। যেমন আপনি যেমন এক বাস্তবতার স্বপ্ন দেখছেন—তারা তেমন একটা বাস্তবতা নির্মাণ করতে পারে, তারপর তার ভিতরকার ভৌতিকতা উন্মোচন করতে পারে। অন্তত এটা বুঝিয়ে দিতে পারে, আপনি যে আশ্চর্য সুন্দর বাস্তবতা বলে যাকে স্বপ্ন দেখছেন, তা কতোটা একঘেয়ে। অথবা তা আপনি মোটেই চাননি। তাই এ সময়ে বসে আপনি যে স্বপ্ন দেখেছেন তা এক অর্থে ভৌতিক হয়ে ওঠেছে। কিন্তু আমার দৃষ্টি কেরেছে এটা যে ঠিক কীভাবে এই সময়ে আপনি এই স্বপ্ন দেখতে পারছেন। অবশ্য-ই স্বপ্ন দেখতে মানা নেই। এবং এটা হয়তো রূপকথার মতোই সুন্দর। কিন্তু এটা আপনাকে অদ্ভুত প্যারাডক্সের মাঝখানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এবং এখন আপনার সেই দৈত্যাকার ভৌতিক কাউচের কথা চিন্তা করতে পারি।
#
সুখী দৈত্যাকার কাউচ— সময়কে স্থির করে দিয়েছে। দৈত্যাকার কাউচ এবার কী করবে? সে আপনাদের স্মৃতিচারণ উপভোগ করতে লাগলো। আপনারা চিরন্তন তরুণ তরুণী—একটা দৈত্যাকার কাউচে বসে আপনাদের ভুলগুলো বলছেন। কে কখন কোন ভুল করেছিলো, এবং তার জন্য তাকে কী শান্তি পেতে হয়েছে। আপনারা হয়তো দস্তয়ভস্কির চিন্তা করলেন। সেই খেলায় মেতে উঠলেন—কে কোনো ভুল করেও কোনো শাস্তি পায়নি। তাছাড়া আপনারা কেউ জানেন না, সময় যখন স্থির তারপরও কীভাবে নতুন কেউ খেলায় ঢুকে পড়ে। নতুন কোনো তরুণ, যে এবার দৈত্যাকার কাউচকে আমোদিত করবে। বলবে—সেই ভুলের গল্প যা করার পরও সে কোন শাস্তি পায়নি। এবং ধরুন যে যে ভুল করে শাস্তি পায়নি— তাদের শাস্তি অন্য কারও কপালে জুটেছে। আর এটাই হয়তো জীবন; দেখা গেলো তারাও দৈত্যের ওপর দণ্ডায়মান। কিন্তু এটা সুখি কাউচ— এখন আর কেউ প্রতিশোধপরায়ন হচ্ছে না। সবাই একে অন্যের গল্পে হাসছে। তখন কেবল ভুলের স্মৃতি না, সুখের স্মৃতিগুলোও দৈত্যাকার কাউচ উপভোগ করতে থাকে। সে কাউকেই ছুঁড়ে ফেলে দেয় না। সবার জন্যই যথেষ্ট জায়গা সে দেয়। সে বলতে পারতো, খামোশ! এবার আমি গল্প বলবো, কিন্তু দৈত্য তা বলে না। এবং সে শুনেই সুখি। যখন কেউ চলে যায় তখনও তার সুখ শেষ হয় না। অবশ্য কেউ জানে না কীভাবে তারা চলে যাচ্ছে। তারা নিছক উধাও হয়ে যাচ্ছে। এই তো জীবন—আহ্ সুন্দর জীবন। এবং দৈত্যাকার কাউচ জানে, অবশ্যি এই সৌন্দর্য ধরে রাখতে হবে। আপনারা যখন দুখের স্মৃতি বলছেন দৈত্যাকার কাউচ তখন আবেগতাড়িত হচ্ছে। কিন্তু সে জানে অবশ্যই তাকে উদ্যাপন করতে হবে। দুখের স্মৃতি এমন—আপনি একজনকে গভীরভাবে ভালোবেসেছেন, কিন্তু সে নিছক আপনার সাথে প্রতারণা করেছে। কিন্তু আপনি জানেন, তারপরও আপনার প্রিয় মানুষের তালিকায় সে আছে। ফলে আপনি তাকেও কাউচে বসা দেখতে পাচ্ছেন। কিন্তু এখন সুখি সময়। এখন আর কোনো ক্রোধ নেই। আপনি তার দিকে তাকিয়ে হাসি দিলেন। সেও সুন্দর হাসি দিলো। আপনি ভাবলেন—কি নিষ্পাপ হাসি! একে অন্যের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। দৈত্যাকার কাউচ ভাবছে—হ্যাঁ দুঃখকে এভাবেই উদযাপন করতে হয়। সে তার সুখকে রসিয়ে রসিয়ে ভাবতে লাগলো। এবং অবশ্যই সময় স্থির হয়ে গেছে। অবশ্যই আপনার প্রেমিক তার ভুলের শাস্তি পায়নি। সে তার শাস্তিহীন ভুলের খেলা খেলে। আপনিও তা বেশ উপভোগ করেন। আপনার প্রিয় অন্যরাও সেটা উপভোগ করে। আশ্চর্য হাসিতে আপনার দৈত্যাকার কাউচকে মাতিয়ে রাখেন।
#
ধরুন আপনার এক বন্ধু হঠাৎ মারা গিয়েছিলো। তাই সে আর এখানে কাউচে স্থান পায়নি। আপনারা যখন তার স্মৃতি রোমন্থন করলেন, অবশ্যই তা দুখের স্মৃতি। তার অবশ্য এত তরুণ বয়সে মরার কথা ছিল না। কিন্তু তার ক্যানসার হয়েছিলো। কিন্তু সেই রোগে তার মৃত্য হয়নি। মৃত্যু হয়েছে অন্য এক অদ্ভুত রোগে, যার সম্পর্কে আপনার ধারণা নেই। কিন্তু যখন তার মৃত্যু হয়েছে, তার আসলে ক্যানসারেই মরার কথা ছিলো। কিন্তু আপনার বলাবলি করলেন, নিশ্চয় সে ক্যানসারে মরতো না। সবাই বললো- নিশ্চয় নিশ্চয়। তার আসলে ক্যানসারের মরা উচিৎ ছিলো। সে কিনা এমন রোগে মরলো, তার মধ্যে যে রোগ নেই! সবাই অবাক। তার অবশ্যই ক্যানসারে মরা উচিৎ ছিলো। কিন্তু সময় স্থির। মানুষ তখন মরলে তা কেবল সংখ্যা। তখনও কি সময় স্থির ছিলো? কেউ প্রশ্ন করলো। কেউ অবশ্য উত্তর দিলো না। যেমন প্রতিদিন একটা সময় মানুষ কেবল টিভি এটা জানার জন্য দেখে যে, সংখ্যা কতো হলো। অবশ্যই স্তালিনকে স্মরণ করা যায়। এই মৃত্যু মোটেই শোকের না। কিন্তু আপনাদের কাছে সেটা অনেক পুরাতন কল্প—দুখের স্মৃতি। দৈত্যাকার কাউচ জানে, স্পষ্টভাবেই দুখকে উদযাপন করা যায়। দুখের স্মৃতি রসিয়ে রসিয়ে উপভোগ করার মধ্যে এক অপূর্ব সুখ আছে। সুখি দৈত্যাকার কাউচ ভাবে। অবশ্য আপনি জানেন না কাউচ কী ভাবছে। সময় স্থির হয়ে গেছে। আপনারা স্মৃতিচারণ করছেন। আপনি বললেন, আমরা কী কী শাস্তি পেয়েছি, যার জন্য কোনো অপরাধ করিনি, অথবা ভুল করিনি। দৈত্যাকার কাউচ ভাবে, ভুল ও অপরাধের মধ্যে নিশ্চয় একটা পার্থক্য আছে। কেউ হয়তো আপনাকে অনেক সিরিয়াসলি নিয়ে নিয়েছে। বলে উঠেছে—আমি জন্মেছি। কিন্তু এটা নিশ্চয় শাস্তি নয়। কেউ কেউ বললো মধুর শাস্তি। আপনি না জন্মালে নিশ্চয় এটাকে শাস্তি বলতে পারতেন না। এমনকি সাফারিংকেও সাফারিং বলতে পারতেন না। দৈত্যাকার কাউচ এই ধাঁধা নিয়ে ভাবে। কিন্তু আপনি বলেন, জন্ম হলো আশীর্বাদ—এবং তার জন্য একমাত্র পিতামাতাই দায়ী নয়। কিন্তু এখন সময় স্থির এবং আপনারা স্মৃতিচারণ করছেন। কিন্তু হ্যাঁ অবশ্যই আপনারা যে যার পছন্দের বিষয় নিয়ে তর্ক জুড়ে দিতে পারেন। অবশ্যই তর্কটা উপভোগের। অথবা যখন উপভোগের, সময় যেহেতু স্থির ও সুখি, তার উর্ধ্বে কেউ যেতে পারবে না। এবং আপনারা মৃত্যু নিয়েও তর্ক করতে পারেন। মৃত্যু কতোটা সুখের? কোন ধরণের মৃত্যু সবচেয়ে মানবিক? কেউ একজন বলে উঠলো, মৃত্যুই জীবনের অর্থ দান করে। কেউ বললো, মৃত্যু অমৃত। অন্য আরেকজন বললো, মৃত্যুকে বাড়াবাড়ি ধরণের কিছু না ভাবলেও চলে। এটা নিছক জীবনের একটা অংশ। এবার দৈত্যাকার কাউচ যেন নতুন ধাঁধার গন্ধ পেলো। হাউ মাউ খাউ! তাহলে মৃত্যু জীবনের শেষ না? আপনি বললেন, যতক্ষণ তার প্রিয় কেউ না কেউ তার স্মৃতি ধারণ করছে। বাহ ! সবাই ভাবলো, এর থেকে সুন্দর কিছু হতে পারে? আপনি কত সুন্দর কথা বলছেন। সবাই তখন তাদের সেই সব প্রিয় মানুষের স্মৃতি রোমন্থন করতে লাগলো যাদের মৃত্যু হয়েছে। হ্যাঁ তারা অনুভব করতে শুরু করলো, আসলে তাদের জীবন শেষ হয়ে যায়নি। তারা তাদের সাথে আছে। এবং একেকজন তাদের প্রিয় মানুষের গল্প বলতে লাগলো। ধরুন আপনার দাদু ছিল, যে আপনাকে অনেক গল্প শোনাতো—আশা দিতো, স্বপ্ন দেখাতো। এবং এখন আপনি তার গল্প বলতে লাগলেন। ঠিক কীভাবে তিনি আপনাকে আপনার পুরো শৈশব মাতিয়ে রেখেছেন। শব্দ নিয়ে খেলা করতে শিখিয়েছেন। বাক্য দিয়ে নিজেকে বুঝতে শিখিয়েছেন। এখন নিশ্চয় তিনি আপনার উচ্চারিত প্রতিটা বাক্যের মধ্যে আছেন। প্রতিটা শব্দের মাধ্যমে যেন তিনি কথা বলছেন। এবং আপনাদের আরেক সঙ্গী ছিলো একটা সাদা বিড়াল। যেটা আপনাদের সাথে বহু বছর আনন্দের সঙ্গী হয়েছে। আপনার কথায় সবাই বেশ আবেগতাড়িত হলো। আর সময় ঠিক যাচ্ছে না কিন্তু দৈত্যাকার কাউচের উপভোগের উন্মাদনা বাড়তেই থাকছে। এবং তার কাছে যেন ধাঁধাটি উন্মোচিত হচ্ছে—সময় স্থির মানে হলো সুখী সময়ের স্থবিরতা। মানে সময়ের একটা বিস্তার। কিন্তু আপনা কেউ বৃদ্ধ হচ্ছেন না। আপনাদের কারও পিতার লাশ সড়কে আছড়ে পড়েছিলো। যেভাবে ঝড়ের রাতে বৃক্ষ আছড়ে পড়ে। কিন্তু নিশ্চয় তার জীবন শেষ হয়নি। তাকে ভালোবাসে এমন একজন এখনো তো বেঁচে আছে। এবং সে কোনোদিন বৃদ্ধ হবে না। সে নিরন্তর তাকে ভালোবাসতে থাকবে। তার স্মৃতি রোমন্থন করতে থাকবে। ফলে দৈত্যাকার কাউচে কেবল আপনার প্রিয় মানুষ না। সবার প্রিয় মানুষ দৃশ্য পেতে লাগলো। এবং সেসব দৃশ্য তার তার বাস্তবতার কল্পে। তারা স্মৃতির মাধ্যমে তাদের প্রিয় মানুষকে পাশে এনে বসিয়েছেন। হ্যাঁ, দৈত্যাকার কাউচ তা অনুভব করতে পারে। তার বোধ আরও গাঢ় হয়। তার ধারণ ক্ষমতা বাড়ে। সে তার সংরক্ষিত স্মৃতির গভীরে ঢোকে, রহস্যের ভিতরে প্রবেশ করে। তার উন্মত্ত উন্মাদনা আরও বেড়ে যায়। তবে সে জানে সে মদ্যপ নয়। সময় যেমন স্থির, সেও স্থির। তার ভ্রমণের সখ থাকলেও তার সেই যোগ্যতা নেই। সে চলতে পারে না। সে এক হাবাগোবা স্থবির কাউচ। তার উন্মাদনায় বেদনা মিশে যায়। সে চায় থাকে আপনি তাদের ভ্রমণের স্মৃতি বলেন। এসব অবশ্যই সুখের স্মৃতি। কে কে বিশ্বের কোনো প্রান্তে ভ্রমণ করেছেন। হিমালয়ের কাঞ্চনজঙ্ঘা থেকে সাহারা মরুভূমি। মিশরের পিরামিড থেকে চীনের পিরামিড ঘুরে আমার দক্ষিণ আমেরিকার মায়াদের পিরামিড। ফলে আপনারা এবার ভ্রমণের গল্প বলতে লাগলেন। আসলে কোন দেশে মানুষ সবচেয়ে বেশি মাত্রায় আপনাদের আদর আপ্যায়ন করেছিল। কোন জায়গাটা স্বর্গের মতো। ফলে সেখানকার শাসন ব্যাবস্থাও একইভাবে স্বর্গীয়। এক ও অনন্য কেউ তাদের শাসন করছে। যেমন ধরুন ফারাওয়ের মতো। পিরামিডের ইতিহাস দৈত্যাকার কাউচের সামনে জ্বলজ্বল করে ভাসতে থাকে। তারপর আসুক চীনের মহাপ্রাচীর। যেন এক একটি ঐশ্বরিক সৃষ্টি। আশ্চর্যভাবে মানুষ দেওয়ালের শক্তিমত্তা খুব ভালোবাসে। এবং নিজেদের আত্মগত স্মৃতিকে। ফলে একসময় আপনারা সবাই নিজ নিজ স্মৃতিতে ডুবে গেলেন। সুখের সময় স্থির। কিন্তু আপনারা কেউ কোনো শব্দ খরচ খরচ করছেন না। সুখ অপর্যাপ্ত। ফলে খরচের বালাই নাই। আপনারা নিজেদের স্মৃতির অমৃতে ডুব দিয়েছেন।
#
তবে এদিকে ভ্রমণের স্মৃতিকথা দৈত্যাকার কাউচকে উন্মাদ করে তুলেছে। তাছাড়া তার মধ্যে স্মৃতি অনেক জমেছে। কিন্তু এখন সে কী করবে? কিন্তু সে মদ্যপ নয়। সে জানে সে মদ্যপ নয়। তাকে জানানো হয়েছে—সে ভাবে। সে একটা সুখী দৈত্যাকার কাউচ। যে কি না মানুষের সুখের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। সময়কে উদযাপনের সুযোগ করে দেয়। সে আপনাদের এক অভুতপূর্ব বাস্তবতার সহায় হয়েছে। কিন্তু এখন স্থবিরতা কতোটা স্থবির সে ভাবতে পারছে না। কিন্তু উদযাপন থেমে নেই। আপনারা ঠিক সময়টা উপভোগ করছেন। স্মৃতি রোমন্থনে মেতে আছেন। হ্যাঁ, গল্প করেছেন, তর্ক করেছেন, স্মৃতি ভাষায় প্রকাশ ঘটেছে। কিন্তু হঠাৎ ভাষা বিলুপ্ত হয়েছে। দৈত্যাকার কাউচ দেখতে পাচ্ছে, ভাষা বিলুপ্ত হয়েছে। সে দেখতে পাচ্ছে, তার বোধের উন্মাদ উত্তেজনা কেমন লাভার মতো টগবগ করছে। সে ভাবে, হ্যাঁ সে গরম পায়েসের হাড়িতে মুখ ঢুকিয়ে দিতে পারতো। রক্তিম মদের উন্মাদনা উপভোগ করতে পারতো। কিন্তু সে নিছক এক মূক স্থবির কাউচ। এবং তার মধ্যে স্মৃতি সংরক্ষিত হয়েছে। সে এবার সেসব স্মৃতিকে ভাষা দেবে—সে ভাবে। তার মধ্যে যতো গল্প জমেছে, তার তো কাউকে বলা চাই— নয়তো সে ব্লাস্ট হয়ে যেতে পারে। ফলে আপনাদের গল্প বলা শুরু করে। উত্তেজিত কিন্তু সুখী দৈত্যাকার কাউচ আপনাদের গল্প বলা শুরু করে। আপনারা একসময় যে গল্প বলেছেন, যে স্মৃতির রোমন্থন করেছেন, যে সব তর্ক করেছেন, দৈত্যাকার কাউচ সেসব বলতে শুরু করে। প্রথমে আপনারা টের পান না। যখন টের পেতে শুরু করেন, আপনাদের স্মৃতি রোমন্থনে ব্যাঘাত ঘটে। কিন্তু আপনারা কেউ তা বিশ্বাস করতে চান না। কী ঘটছে, তা আপনার বিশ্বাস করতে চান না। এটা মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। আপনারা একে অন্যের দিকে তাকান। এমনকি হতে পারে আপনারা স্বপ্ন দেখছেন। কিন্তু আপনারা ঠিক দেখছেন দৈত্যাকার কাউচ কথা বলছে। এবং সে আপনাদের জীবনের গল্প বলছে। কাউচ আপনাদের কথা বলছে। সে ঠিক আপনার গল্প বলছে। সে যখন আপনার দাদুর গল্প বলে, আপনি ঠিক ধরতে পারেন, এটা আপনার দাদুর গল্প, কিন্তু তারপরও কেমন ভিন্নরকম। আপনাদের কেবল একটা অনুভূতি কাজ করে, যে কাউচটি আপনাদের কথাই বলছে, কিন্তু আপনি মনে করতে পারেন না, এমন কিছু আপনি কোনোদিন কাউকে বলেছেন। কিন্তু আপনি বুঝতে পারেন না, একই স্মৃতি কীভাবে ভিন্ন হয়। একই গল্প হয়তো ভিন্ন হতে পারে কিন্তু স্মৃতি। আর সবচেয়ে ভীতিকর হয়ে ওঠে এটা যে, আপনি কাউচের গল্পকে এড়িয়ে যেতে পারছেন না, একইসাথে নির্দিষ্ট করতে পারছেন না, কোনটা আসলে আসল স্মৃতি। একসময় আপনার মনে হয়, আপনার স্মৃতিতে যেটা আছে, সেটাই আসল স্মৃতি কিন্তু পরক্ষণেই যখন দৈত্যাকার কাউচ বলতে থাকে, তখন মনে হয় সে-ই যেন আসল স্মৃতিকথা বলছে। কিন্তু সুখী কাউচ কোথায় এসব গল্প পেয়েছে? আপনি নিশ্চয় বলেছেন। কিন্তু যখন বলেছেন, তখন এসব বলেননি বলেই আপনার মনে হচ্ছে। কিন্তু আপনি কী বলছেন? আপনারা কী বলেছেন? যেখানে সুখী দৈত্যাকার কাউচ গল্প বলতে থেকেছে—হাবাগোবা সুখী দৈত্যাকার কাউচ। এবং আপনারা শুনতে বাধ্য হচ্ছেন। সে আপনার এমন গভীর সত্য বলতে শুরু করেছে, যা সবাইকে চমকে দিয়েছে। একইভাবে অন্যদের গল্পেও আপনি চমকে উঠেছেন। আপনি দেখছেন, দৈত্যাকার কাউচের গল্পানুসারে যখন আপনারা ভুল ও শাস্তিহীনতার খেলা খেলেছেন, সবাই কেমন নিষ্ঠুরভাবে একে অন্যের সাথে প্রতারণা করেছেন। কিন্তু আপনি মানতে পারছেন এটা হতে পারে। আপনারা বিশ্বাস করতে পারছেন না, আসলে সে সত্য বলছে। কিন্তু উপলব্ধি করছে, সেই গল্প আপনার স্মৃতিতে বিদ্যমান। কিন্তু সুখী কাউচ গল্প বলতে থাকে। তার থামার নাম নেই। এবং সুখের সময় স্থির। কিন্তু আপনার কি দুখি?—আপনারা ভাবতে পারছেন না। কিন্তু একসময় টের পান আপনারা দৈত্যাকার কাউচের গল্প উপভোগ করছেন। দৈত্যকার কাউচের স্মৃতিকথা আপনার স্মৃতি আত্মগত করতে থাকে। আপনারা অনুভব করতে পারেন। হ্যাঁ, আপনার ভাবেন—এটা হয়তো সুখ। অবশ্যই সুখের সময় স্থির। এর একট অপূর্ব বিস্তারে আপনারা যাপন করছেন। আপনারা আপনাদের প্রিয় মানুষের সাথে আছে। এবং গল্প স্মৃতি তর্ক উদযাপন করছেন। সুখী দৈত্যাকার কাউচ গল্প বলছে—আপনি আপনার স্মৃতি উদযাপন করছেন। হৃদয়ের রোগ—ক্ষত ভাষা পাচ্ছে আপনারা উদযাপন করছে। ক্রোধ-লোভ—প্রতিহিংসা প্রকাশ পাচ্ছে আপনারা সুখের স্থবিরতা উদযাপন করছেন। স্মৃতি মন্থিত হচ্ছে। সুখী দৈত্যাকার কাউচ তাতে ভাষা দিয়ে চলেছে। অপরাধ ও শাস্তি; অপরাধ ও শাস্তি; অপরাধ ও শাস্তি, এবং নিষ্ঠুরতা; এসব খেলার মতো, যেন লাটিম ঘুরছে তো ঘুরছেই—মহাকর্ষবল উপেক্ষা করে ঘুরছে। যেমন আপনাদের ভুল—শাস্তি খেলা সত্যমিথ্যার দোলাচলে দুলছেই। সব ভাষায় প্রকাশ পাচ্ছে, ও আপনারা উদযাপন করছেন। এবং সুখী দৈত্যাকার কাউচ—তার ক্লান্তি নেই। সময় তার বিস্তারের পথে স্থির—সুখের সময়; দৈত্যাকার কাউচ স্মৃতিকথা গল্পে যায়, গল্প থেকে তর্কে যায়, যখন ভ্রমণকথায় যায় তার মুখ চকচক করতে থাকে। আপনার স্মৃতি রোমন্থন করতে থাকেন। দৈত্যাকার কাউচের উচ্চারণে আপনারা স্মৃতি রোমন্থন করতে থাকেন। ফলে সুখের সময় চলতে থাকে—অপূর্ব স্থবিরতায় সময়ের তার সুখের বিস্তার দোল খায়।
অহনা সরকারের লেখা
মার্চ মাস এমনিতেই বিশালত্বের শহর। আমার কাছে। বিশাল বিরাট বড় একটা মাস, সাথে করে হাজারো ঝামেলা। কাজের মানুষ হলে ট্যাক্স পে, অডিট, আরো নানান হাবিজাবি। আর কাজের মানুষ না হলে তো আরো ভয়ানক- পরীক্ষা, তার রেজাল্ট তার পরের বাকি থাকা অজস্রতম বকুনি! মোটামুটি এরকমই চলে আসে চলে আসছে সেটাই দেখা দেখে এসেছি। এবারে যেন হঠাৎ করে সবকিছু নিখরচায়!
তবে নিঃখরচা কথাটা ঠিক নয়, কারণ যে আসছে তার জানানোর খবর সে বেশ আগে থেকেই স-রবে জানাতে শুরু করেছিলো, আমরা নর্মালি তৃতীয় বিশ্বের অধিবাসী প্রায় সমস্ত কিছুতেই লেট লতিফ। সে ভাষা হোক খাওয়া বা অভ্যাস অনুসরণ। সবই প্রায় প্রথম বিশ্বে নাজেহাল হয়ে তবেই আমাদের দরজায় দয়া জানান
করোনা।একটি ভাইরাস। এখন তো সবাই প্রায় আবালবৃদ্ধবনিতার কাছে এটি একটি আতঙ্ক। আমার কাছেও। যখন প্রথম ভেবেছিলাম, এই বিষয়টা নিয়ে লিখবো, তখন এদেশে ভারতে করোনা তার পা রাখেনি। প্রথম যাত্রা, তারপর দ্বিতীয় বা না তৃতীয় কোন স্তরে আছি এখন আমরা তাও জানিনা।
কিন্তু অদ্ভুত হচ্ছে "বেকার" এই শব্দবন্ধের সাথে এসবের কি যোগাযোগ! বা আগে এত গেঁজানোই বা কেন! বেকার! বড় অদ্ভুত না শব্দটি! আকারের দিক থেকে বা চেহারায় ব আক্রান্ত কারক বা করম
ব বোধ বা যদি বোধন বলি
একটা মৃত্যুসিন বলি, এইমাত্র দেখা একটা ছবি। কেউ একজন মারা গেছেন, আর একজনের অনবরত কান্না, আস্তে আস্তে লোক সমাগম, একসময় জানা যায়, যিনি মারা গেছেন, তিনি অসুস্থ ছিলেন এবং যে কাঁদছে তার ঘনিষ্ঠতম কেউ। দেন, বেশ কিছু মানুষ ব্যান্ড ঢোল হাতে ঘরে প্রবেশ করে, নৃত্যগীত শেষ হয়। মেঝেতে একটা ছাগল দাঁড়ানো !
পুরো বিষয়টাকে আমার অদ্ভুত বেকার বলে মনে হয়। কোনো মানে নেই বা অতিমানেধক্। সাধারণের বুদ্ধিবৃত্তের বাইরে। আমি সাধারণ ভেবেই নিজেকে বললাম। কিন্তু সেই অর্থে কি ছবিটা বেকার? তা অবশ্যই নয়। প্রচুর মানুষের পরিশ্রম ভাবনা তাদের দেখা এবং যারা বুঝবে তাদের দেখাও।
বেকার।
আমাদের দেশে ২৪শে মার্চ, প্রথম লকডাউন শুরু হয়। এই প্রথম হয়তো অনেকে এই শব্দটার সাথে পরিচিত হই। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত, মানে এপ্রিল। এখনো ঠিক জানা নেই এটা কবে উঠবে। অফিসকর্মীরা যাদের কাজ বাড়ি থেকে সেই অর্থে ওয়ার্ক ফ্রম হোম সম্ভব নয়, তারা বাড়িতে বেকার বসে। বোর হচ্ছে কখনো মানসিক উদাসীনতাও এবং অদ্ভুত ভাবে ঠিক এই সময়ই আমাদের দেশের প্রায় সমস্ত ক্ষেত্রে কি পারফেক্ট ভাবে এই শব্দটাই যত্রযত্র। উদ্ঘট লাগছে? এখনো পর্যন্ত প্রায় ঊনপঞ্চাশ জন মারা গেছেন। হেঁটে ফেরার চেষ্টায় না খেয়ে গাড়ি চাপা। হুঁ পরিযায়ী শ্রমিক। বাংলাটা দারুণ না! পরিযায়ী চিল্কায় দেখেছিলাম, পরিযায়ী পাখি!
ভারতে স্ব এবং কেন্দ্রশাসিত মিলিয়ে ছত্রিশ টা রাজ্য আছে। নিজেদের নিজেদের আইনি কাঠামো ব্যবস্থা, রাজস্ব রোজগার। যুক্তরাষ্ট্রীয় গণতন্ত্রের কাঠামো অনুযায়ী। ভারতে এখন বেকার, মানে আনএমপ্লয়েড মানুষের সংখ্যা, সরকারী মতে মানে যাদের নাম এক্সচেঞ্জ ভুক্ত, মোট জনসংখ্যার ২৭%। তার বাইরে বোধহয় ইনফিনিটি অগুন্তি।
"বেকার" এই শব্দটা কিন্তু আশ্চর্য ভাবে অদ্ভুত। যেমন ধরুন যদি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে ধরলে, কলকারখানা প্রায় কিচ্ছু নেই, কৃষিক্ষেত্রে শোষিত মানুষদের নরমালি শ্রমিক হিসাবে ধরা হয় না, চল নেই এখানে, কিন্তু তারাও শ্রমিকই। একদম আরো… আরো নিচে নেমে গেলে ধরা যাক হালখাতায় যারা খাতা তৈরি করতেন, শোলার কাজ পূজোর সময় মাটির কারিগর, মাটির প্রদীপ, বিভিন্ন বাসন বানাতেন যারা, মাদুর চাটাই বুনতেন সে সব মানুষ বা খুব পিছিয়ে গেলে একসময় স্টেজে নারীর চরিত্রে অভিনয় করতেন সে শিল্পীরা। আরো আরো গভীরে নেমে আরো খুঁজলে "বেকার"! শব্দ নয় কেমন যেন এক চরিত্র হয়ে উঠছে। আমরা যত এগোচ্ছি দ্রুত হচ্ছি তত হয় তাকে সঙ্গ জানাচ্ছি নয়তো হাত ছাড়িয়েই …।
আমরা কি জানি! এই আমরা একশ সাঁয়ত্রিশ কোটির মধ্যে অসংগঠিত শ্রমিক সংখ্যা প্রায় চল্লিশ কোটি, যার মধ্যে পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় চার কোটি। আঁতকে উঠলাম! কে জানে! কালকেই দেখলাম, একজন মানুষ তার সাইকেল ওনার ওয়াইফ আর তার কোলের শিশুটি ২৫০০ কিলোমিটার হেঁটে আসছেন। পরিযায়ী শ্রমিক!
এই যে আমাদের দেশ যা নাকি জনকল্যাণমুখী প্রজাতান্ত্রিক গণতন্ত্র এসব লেখা আছে আর কি সংবিধানে! দেশের সরকার, আমাদের দেওয়া ট্যাক্স সবই আমাদের কল্যাণ করার জন্য। জনমুখী কল্যাণ, মানুষের থাকা খাওয়া এবং বাঁচা একদম এই তিনটে সাধারণতম দায়িত্ব পালনের জন্য। তারা সেটা অবশ্যই করেন না। কারণ সেটা সম্ভবও নয়। না, নৈতিক ইচ্ছে টিচ্ছে ওসব বড় বড় বইমুখী কথা সেসব নয়। তারা তো আমাদের মধ্যে থেকেই উঠে আসা। আমাদের নিজেদের মধ্যে কি আছে এই বোধ! জনকল্যাণমুখী! বোধহয় না! কারোর কারোর থাকাটা গণ্যতার মধ্যে পড়ে না বিন্দুমাত্র। সবার না হোক অ্যাটলিস্ট সংখ্যাগুরু মানুষের? না নেই। শুনতে স্বীকার করতে অস্বস্তি হলেও বিন্দুমাত্র নেই।
তাই ভবিষ্যৎ এর কোনো নামী "কবি" এই হেঁটে আসা মানুষেরা বাড়িটুকু যাতে পৌঁছাতে না পারে তার জন্য বর্ডার সিল করার সমর্থনে গলা চড়িয়ে বলতে পারেন, "যা করেছে ঠিক করেছে"! বা বাইক আহত এক যুবককে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে একের পর এক গাড়ি তাকে নির্দ্বিধায় চাপা দিয়ে পিষে মেরে বেরিয়ে যেতে পারে। একটা দুটো নয় কমপক্ষে পঞ্চাশটা! উদাহরণ দিলাম। চারপাশে তাকালে এমন সংখ্যা কোটি কোটি দেখতে পাবো। তো এই আমাদের মধ্যে থেকেই এই মানসিকতা নিয়ে যারা আমাদের শাসনে রক্ষার দায়িত্বে বসছেন, তারা এমন হওয়াটাই লক্ষ্য।
আমাদের শিক্ষা এত কোটি কোটি ডিগ্রি এত বড় বড় পদাধিকার! পাশে রেখে দেখুন "বেকার"! ভীষণ ভীষণ অ্যাপ্রোপ্রিয়েট লাগছে।
এখন লকডাউনের সময়। এই নতুন আসা শব্দটা কি কি দেখালো বলি একটু -
এই এত এত ঝাঁ চকচকে রাস্তাঘাট শপিংমল কথার মাত্রায় গাড়ি, গরম লাগতেই এসি! হ্যাঁ আমরাও চালাই। লুধিয়ানার এক বাড়ির ছাদ থেকে হিমালয় দেখা গেছে! উত্তরপাড়া থেকে হাওড়া ব্রিজ! শিলিগুড়ি থেকে অদ্ভুত রংমিলান্তি কাঞ্চনজঙ্ঘা!
এই ঝাঁ চকচকে রাস্তার বদলে যদি আরো আরো গাছগুলো থাকতো। শপিংমলের বদলে যদি এখনো পাড়ার ছোট্টো মুদি দোকানটা। বাড়ি থেকে সামনের জাস্ট পাঁচ মিনিটও হয়তো নয় দোকানে যেতে নিজের পা।
লকডাউন উঠে গেলে আমাদের হয়তো আর মনেই পড়বে না কলকাতার রাস্তায় দাঁড়িয়ে অনেক রাতে আশ্চর্য ছায়াপথ দেখা যায়! ধুর ধুর কি হবে ওসব গাড়ি আছে চালাবো না তো কি! বেকার যত্তসব!
নামের মাত্রায় যেখানে সেখানে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা স্কুল, হসপিটাল, প্যাথোলজি সেন্টার, বিশাল বড় ডিগ্রিধারী প্রেসক্রিপশন! কি অদ্ভুত নিরর্থক বেকার না! তার চেয়ে বরং সম্পূর্ণ ঠিকঠাক কাঠামো অনুযায়ী সরকারী স্বাস্থ্যসেবা থাকতো, সেইমতো ডাক্তার, স্কুলের শিক্ষায় ৯৯% পাওয়ার গৌরবের দল। কিন্তু ওই লকডাউন উঠে গেলে যা আছে ঠিক আছে গুরু! ওসব সরকারীফারি সব বেকার!
যে মানুষগুলো হেঁটে আসতে চেয়ে গাড়ি চাপা পড়ল, রাস্তায় মারা গেলো কীটনাশক স্প্রে করা হলো, আমাদের কাছে আমরা নিজেরা ছাড়া আর বাকি সবার থাকাটাই বোধহয় বেকার। শুধু আমি থাকবো, সবেতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুরক্ষা, বাঁচা, গান, কবিতা, আঁকা সবেতে অনলি মি! ফেসবুকের এই প্রাইভেসি সেটিংটা কিন্তু দারুণ লাগে!
বাকি না থাকলেই বা কি হয়! ধুর নোংরা সব ছোটোলোক ওরা তো থাকা না থাকা বেকার!
কখনো কখনো উল্টো হাঁটতে হয় জানেন তো, যেমন প্রকৃতি বলা যায় এখন নিজের স্পেস পূরণ করছে শূন্যস্থান।
মাঠে যারা চাষ করেন, বৃহৎ পরিমাণ এই জনঘনত্ব রিয়াল এসেস্টের যারা শ্রমিক, ঠিকাদারের, এই রাস্তা তৈরী কলকারখানা শ্রমিক। অন্যের বাড়িতে কায়িক পরিশ্রম দেন যারা, তাদের নিম্নতম মজুরি কি হওয়া উচিত আমরা জানি! ধুর ধুর ওত জানা সম্ভব নাকি! সেটা অবশ্য ঠিকই! ভারতের পূর্বতন শ্রমিক আইন মতে একজন অদক্ষ শ্রমিকের প্রতিদিনের মজুরি হওয়া উচিত চারশোর কাছাকাছি। পার ডে! এমন শ্রমিকও আছেন যারা ছ মাসে হয়তো চারশো টাকা রোজগার করেন কখনো সখনো!
এবার ভাবুন জাস্ট একবার ভেবে নিন, কোনো একদিন এই সমস্ত মানুষের পরিসংখ্যান ছাড়া যাদের সংখ্যা মোটামুটি বলছে চল্লিশ কোটি।তারা সবাই একে একে দাঁড়িয়ে পড়ল থেমে গেলে সম্পূর্ণ, সম্মিলিত গলায় জানালো
"আজ থেকে আজে র পর থেকে আপনাদের কাজ আপনারই করুন।আমরা স্বেচ্ছা বেকারত্ব নিলাম।"
ভাবুন। ভেবে দেখুন না একবার জাস্ট সেকেন্ড সেকেন্ডের মধ্যে এই সমগ্র পৃথিবী বেকার হয়ে যাবে। আমাদের বেঁচে থাকা। জাস্ট "বেকার" হয়ে যাবে।
আমি না বেশ আশাবাদী না হলেও নিরাশাবাদী মানুষ নই। জানি না, ঘটবে কি ঘটবে না, কিন্তু এই করোনা ইউরোপীয় আর আমেরিকা অর্থনীতির একদম ছাল চামড়া ছাড়িয়ে দিয়েছে। হাড় কংকাল বেরিয়ে গেছে বলা যায়। ওসব দেশেই যদি এ অবস্থা হয়, যাদের সর্বমোট জনসংখ্যা বোধহয়, ভারতের একটা রাজ্যের জনসংখ্যার সমান! সেখানে আমাদের এখানে করোনা ওই আকার নিলে কি হবে! কারণ আমরা অদ্ভুতভাবে যেটা একদম শিখিনি বা জানিনা সেটা হলো ডিসিপ্লিন। আমাদের স্কুলে চেঁচানি বন্ধ করতে ক্লাস মনিটর লাগে, আর রাস্তা থেকে ঘরে ঢোকাতে পুলিশের লাঠি! নতুন করে বোধহয় বলার অপেক্ষা রাখেনা আমাদের স্বাস্থ্য থেকে শিক্ষা, অনুভূতি থেকে জনানুভূতি সমস্ত খোকলা, ঝুরঝুরে সমস্ত কিছুকে ঢেলে সাজানোর জনবিল্পব। যা অর্থনীতির চূড়ান্ত এই ধনবৈষম্যকে জনকল্যাণ বানাতে পারে।হবে কি হবে না করোনা পরবর্তী কি হবে না হবে! জানিনা, তবে আমরা সম্পূর্ণ বেকার হয়ে যাবার আগে আসুন না একবার ভাবনায় অ্যাট লিস্ট ভাবতে শুরু করি এই ক্রমশ বেকার হতে থাকা মূল্যবোধ, মানুষ, প্রকৃতি, আকাশ, সময়, স্বপ্ন, বেঁচে থাকা, কাজ
আস্তে আস্তে হাত ধরি সবার কাছে যাই দাঁড়াই তাদের পাশে গিয়ে। তারা হয়তো এখনো আমাদেরই অপেক্ষায়
এখনো, বেকার দাঁড়িয়ে
আশা রাখলাম
নির্লিপ্ত ভেজা ন্যাকড়াখানি
তৃপ্তি সাঁন্ত্রা
খাটের বাজুতে শুয়ে আমি যা যা দেখি-
চোখ ভরা জল। মোবাইলে চার্জ নেই। ছবি তুলে পোস্ট দেওয়া যাচ্ছে না। কেন্ আয়নার সামনে গিয়ে নিজের কান্না দেখছে। ঘরে রোদ আসছে। রোদে ঠিক এফেক্টটা আসছে না। সে পর্দা টেনে দিল। চাইনিজ পর্দা বেশ জমকালো। মার মতো সেও জমকালো পছন্দ করে। স্ট্যাটাস একটু হাই হলে সুতি বাই থাকে। সুতির দাম বেশি। পুলুমাসির সুতি- বাইলুম-এসব কালেকশন দেখে খুব চার্জড মা। নিচের বুটিক থেকে একটা লক্ষ্ণৌ চিকন কিনলো আড়াই হাজার টাকা দিয়ে। শাড়ি দেখে মোটেও বোঝা যায় না। মার ওই শাড়ি কেনার ঝোঁকই বা হল কেন কে জানে! তাই নিয়ে বাড়ি তুলকালাম। দুপুরেও নেমন্তন্ন থাকে কোথাও কখনো। গরমে সেখানে তো বালুচরী বা আসাম সিল্ক পরা যায় না। তাই হয়তো। খুব হুজুগে নাচে মা।
এই হুজুগে আবার চাইনিজ পর্দা ছুঁড়ে না ফেলে। তবে আবার এই নতুন পর্দা কেনা নিয়ে শোরগোল হবে। কী এক করোনা ভাইরাস না কী চিন থেকে এসেছে। তো ছুঁড়ে ফেল চিনকে!
চিনকে ছুঁড়ে ফেলার কথা বলতেই হাতের শাওমী চোখ মটকায়। বাটির ওয়াই- ওয়াই শ্রাগ করে, চিংকি হাসি দেয়। শুধু কি এরা দুজন! আরো কত কত যে চিনের মাল- ইলেকট্রনিকস্ যন্ত্রপাতি, গ্যাজেট .. সে সব বাদ দিলে রোজকার শরীর পরিস্কারের যন্ত্রপাতি- টুইজার- নেলকাটার- রেজর? ন্যাপচা মুখের হলুদ চামড়ার চোখ ছোট মেয়েদের ছেলেদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করা সহজ, কিন্তু প্রোডাক্টগুলো?
‘চিংকি’ শব্দটা উচ্চারণ করে কেন্ কুলকুল করে হাসে। মাসির ননদ আসে তাদের বাড়ি। গায়ের রং সাদা। চাকরি করে বলে খুব ডাঁট। সামনে খুব প্রশংসা মার, ঠাম্মার। চলে এলে বলে- সবই ভালো, দেখতে পলিয়াদের মতো, না?
কেন্ টিভি খোলে। টিভি খুললে আমার ভয় লাগে। কী জানি কী আবার দেখাতে শুরু করবে। না নিউজ চ্যানেল না, সে যায় বিনোদন চ্যানেলে। কেনের ঠাকুরমা দেখে ২১২- ওল্ড ইজ গোল্ড চ্যানেল। সেসব চ্যানেলে নদী থাকে। গাছপালা পাহাড়-পর্বত। শাড়ি কাপড় উড়নি। মায়াবতী মেঘ ও কন্যারা থাকে। মা দেখে বাংলা সিরিয়াল। এর ওর ঘরের কুটকাচালি দেখতে দেখতে নিজের ঘরে আগুনের মতো ধোঁওয়া হয়। খুকখুক কাশি সারে না মা, মিলির। কেন্ রিয়েলিটি শো দেখে। কত অসম্ভব অসম্ভব ঝুঁকি নিয়ে সারাদিন লাফাচ্ছে তাগড়া তাগড়া জোয়ান মদ্দ। জীবনের রিয়েলিটি শো তে তারা টুপটাপ। শুধু মোবাইলে ছবি তোলে, পোস্ট দিয়ে লাইক পাবার জন্য। বাঘ চিবোয় ফটোগ্রাফারকে। আফরাজুলকে পিটিয়ে গায়ে তেল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে ছবি পোস্ট দেয় আততায়ী। কিশোরীটির জামা কাপড় ছিঁড়ছে। খামচাচ্ছে। ছিঁড়ছে। খাচ্ছে। ছবি তুলছে আমোদ গেঁড়ে পাব্লিক।
আর দেখে মিউজিক চ্যানেল। আমি গান শুনতাম। ওহো! এখন আমার কথা না। আমার কথা পরে বলি। এখন কীরকম আলো আওয়াজ ভিড় ধামাকা নিয়ে গান। কেন্ দেখে। কেনের পোষাকি নাম কর্ণাবতী। একটা দামাল ছলছলে নদীকে বাঁধ টাধ দিয়ে সাইজ করা। কর্ণাবতী যখন কেন্ হয়ে যায় – বিদেশি ট্যুরিস্টদের উচ্চারণের সুবিধা।
রিজেন্টপার্কের কর্ণাবতীও কেন্ হয়ে রেজাল্ট ভালো করার কঠোর সাধনায়। আমেরিকা স্বপ্ন।
সে রোগা। বুকটুক তেমন নেই। লিকলিকে পা। জিনস পরলে আরো রোগা লাগে। ভালো রেজাল্ট করতে হবে তাই বাড়িতে কোনো কাজ না করার ছাড়। প্যান্টি, প্যান্ট, জামা, মাসিকের ন্যাকড়া সব মেঝেতে ফেলে রেখে দেবে। মা, ঠাম্মা কাচবে। ওই যাঃ! আমি কেমন ব্যান্ডেড প্রোডাক্টের মধ্যে নিজেকে জুড়ে দিলাম। এখন ওসব ন্যাকড়া কানি কেউ নেয় নাকী! ন্যাপকিন, ন্যাপকিন। ইউজ অ্যান্ড থ্রো!
ওয়ান টাইম ইউজ , পোস্ট মর্ডান টেকনোলজি। কত। কত। ক- ত প্রোডাক্ট। যেমন খুশি সাজি। খুলে ফেলি। ছুঁড়ে ফেলি। পকেট ভরা থাকলে আবার পাওয়া যাবে। অঢেল। প্রচুর। ......
ছুঁড়ে দেওয়া মাল ভাগাড়ে, নর্দমায়, নদীতে জঞ্জাল বাড়ায়। তো এক হিসেবে ভালোই না! খানাখন্দডোবাপুকুর নদী বুজিয়ে মেটে হাইরাইজ ক্ষিধে। গরিবগুর্ব্বো গ্রামগঞ্জ পাছার কাপড় খুলে শ্রম দেয়। আর তারপর রক্তমাংসের সেই মানবসম্পদেড় জঞ্জাল হাপিস করতে ছোটাও হাঁটাও মারো পিটাও। ছোটাও একবার পুব থেকে পশ্চিমে। একবার পশ্চিম থেকে পুবে।
আঙিনায়, ঘরে- শস্যধান্যঅন্নের উঠোনে লক্ষ্মীর পা কেমন সুন্দর লাগতো। খবরের কাগজের ফ্রন্ট পেজ জুড়ে এলোমেলো টলমলে লাল পায়ের ছাপ... কেউ থেমে যাবে। কেউ কঁকিয়ে ছেঁচড়ে গড়িয়ে চলবে- রক্ত মেখে মাংস মেখে কাঁকর মাটিতে পাথরে ক্ষতবিক্ষত পায়ের পাতা যেন ক্ষুধার্ত হা-মুখ..
জামলো মা কদম বারোর মতো লু্টিয়ে পড়া কেউ পূর্ণিমা সরদারের পেটের বাচ্চা খলবল থাকে গর্তগর্ত ছাল ছাড়ানো দগদগে পায়ের পাতা বেঙ্গালুরু থেকে বারমার রাজস্থান ১৮৭০ কিমি কতটা পথ হাঁটলে গাঁড়োলচোদা কাঠ্ঠাজান ফুটন্ত তেলে ফ্রাই হতে হতে দাউদাউ আগুনে যায়… এই সব মায়া বাস্তবতা।
কেন্ পেপার পড়ে না। নিউজ চ্যানেল না। জানেও না কী ঘটছে চারপাশে। ঘরবন্দী অখন্ড সময়ে কেনের বাবা দেবু, বউয়ের বানানো নিত্যনতুন টিফিন আর লাঞ্চ আর ডিনার সারতে সারতে দেখে খালি পা মানুষের মিছিল। লাইনের ওপর শুয়েছিল কারা – মালগাড়ি চেপটে দুমড়ে দিয়েছে। বুরবাক শালারা। ড্রামাবাজি। আর কোথাও জায়গা পেলি না শোওয়ার !
কেনের মা মিলি আজ ফেবুতে ভালোমন্দ রান্না পোস্টাবে। না। কাগজ পড়া, টিভি দেখার চেয়ে মিলির একটা ভালো করে ছবি তুলে দেওয়া ভালো। মিলি খুশি হবে। কত্ত লাইক পাবে! এখন ওই লাইকের তাপেই বেঁচে থাকা।
ফেবু নানা খবরের ফুলঝুরি। এর মাঝে মানবাধিকার সংগঠন, দলিত ক্যামেরা খবর দেয় নানা রকম …
জর্জ ফ্লয়েডকে আমেরিকার পুলিশ মারল। ৫০০ জন গ্রেপ্তার হল। ৬ ডিসেম্বর ২০১৭ মালদার জালালপুরের আফরাজুলকে, রাজস্থানে পিটিয়ে পেট্রল ঢেলে হত্যা করে শম্ভুলাল রেগা।
১ লা এপ্রিল ২০১৭ দুধ ব্যবসায়ী পেহেলু খানকে, গরু চুরির মিথ্যা অপবাদে গণপিটুনি। ৪ এপ্রিল মারা যান পেহেলু। জবানবন্দিতে ৬ জনের নাম দেন। কারো শাস্তি হয়নি। জবানবন্দিতে ডাক্তারের সই ছিল না।
আফরাজুলের মামলার নিস্পত্তি হয় নি।
ভুল কিছু হয়ে যায়। অত শাস্তি শাস্তি করে চ্যাঁচানো কি ! ক্ষমাই ধর্ম ভারতবর্ষে। আর তাছাড়া পূর্বজন্মের সুকৃতি বলে একটা কথা আছে না ! কর্মফল ! খণ্ডায় কে!
শুধু মানুষ নয়- পশুদেরও ইহজন্ম পরজন্ম হয়। সেই জাতক। কথাসরিৎ কথা।
হাতিটা মরল পেটের মধ্যে বোম ফেটে। আনারস বোম। তো পাব্লিক অতো কি বুঝবে ! তারা তো পেট ফুঁড়ে ভ্রূণ বেঁধা তরবারি জানে- জয়শ্রী রাম ! যত মত তত পথের কথামৃত আবার কি ! সব কথা মৃত !
আমার কথা একটু বলি। একটু কোণঠাসা বিলীয়মান বস্ত্রখণ্ড আমি। বাংলার তাঁত। সেই যে মিলি সেবার দুগ্গো পুজোয় একটু বাঙ্গালিয়ানা আনতে কাস্তে পেড়ে ধনেখালি আমায় জড়িয়ে কাহালায় পুজো দেখতে গেল। বামুন পাড়ায় খান তিন পুজো। সিংদের জোতদার বাড়িতে পুজো। বড়োলোকি পাঁঠার গায়ের গন্ধে টেকা দায়। তো মাংসে যাতে খুব গন্ধ না হয় কারণ বারি খাইয়ে খাইয়ে শুদ্ধ, সুগন্ধ বলির পাঁঠা করে রাখা হয়েছে তাকে। আর ফুলহার নদীর চরে। মাইকে ডাক পড়ছে ঘন ঘন। অমর মণ্ডল – সীতারাম হালদার- আশিস পাঠক … শত শত নাম ডাকা চলছে। কীসের রোল কল ?
মিলি কাছে গেল। দেখতে। আমিও দেখলুম। বলি কাঠে মাথা চেপে ধরেছে একজন। কপাত কোপ। মাথাটা মায়ের চরণে রেখে, গলগলে রক্ত মাখা কবন্ধ পাঁঠার শরীর নিয়ে উৎফুল্ল ভক্ত ছুটছে বাড়ির পথে।
আকাশে ঘন কালো মেঘ। আমি চেয়েছি বৃষ্টি আসুক। খুব জোর বৃষ্টি। বাড়ি ফিরে আমাকে ছেড়ে বারান্দায় মেলে দিক মিলি- আমার শরীর খারাপ করছে। এই সব রক্তছবি দেখে মাথা ঘুরছে আমার। তাদের বারান্দার পাশে শিউলি গাছ দেখেছি। তারে মেলা, ভিজে আমি চুপচাপ সেই ভিজে গাছ দেখবো। পৃথিবীর মানুষের রক্ততৃষ্ণা কবে যে শেষ হবে !
বৃষ্টির ভয়েই বড় ভুটভুটি করে সব্বাই ছুটেছি বাড়ির পানে। মিলির গায়ে জড়িয়ে আমি। পথে- ছোট রাস্তায়- বড় রাস্তায়- খেতের পাশ দিয়ে- ডোবার ধার ঘেঁষে- উৎফুল্ল মানুষ ছুটছে- হেঁটে- সাইকেলে- মাথা কাটা পশুটির গলা চিমটে ধরে- দৌড়াচ্ছে পৃথিবী …
আমায় পরে আসলে কেন মিলি? আমি মোটেও এসব দেখিনি। দেখতে চাইনা।
তুলো কেটে সুতো। তক্লিতে। মেশিনে। পুরনো ধারায়। নতুন ধারায়। বয়ন শিল্প। কখনও বেগম বাহার ছিলাম। পরিলীলা সূক্ষ্মতা। ছোটো দেশলাই বাক্সে পোরা যায় এমন শাড়ি। কত রাজরাজড়া পেরিয়ে বানিয়াদের হাতবদল হয়ে- এখন এই ধনেখালি শরীর খানি … মিলির অঙ্গে কেমন মানায়। গুলশানারা পরলেও কেমন ঝলমল করি …কত স্টাইল করে পরে ও … রাঙামাটির পিংকি হাঁসদা, কেমন রাজেন্দ্রাণী লাগে ও পরলে।
ওদের পরা হয়ে গেলে আমি হয়তো যাব চায়না কি সুমিতার ঘরে। সুতি শাড়ি মেইনটেইন করা অসুবিধা। ওরা তুলে পেড়ে ঘরোয়া অনুষ্ঠানে পরবে। সিন্থেটিকের বাজার এখন। খুব গরমে সিন্থেটিকে ঝলমল করতে করতে ঘামবে।
শেষ রাতে শিরশিরে হাওয়া বইলে, সুমিতা চায়না আমায় জড়িয়ে স্বস্তি পায়, এটা বেশ লাগে।
অনেক পুরনো হয়ে গেল- পাড়টা খুব সুন্দর দেখে কেউ হয়তো বাহারি কাঁথার জন্য রাখবে। বডি হয়তো যাবে চায়নার বাড়ি। বিক্রমের বউ পোয়াতি। কাঁথা হব আমি।
কত রকম টাওয়াল এসে আমায় সরিয়ে দেয়। তবে ধরো, ওই খুব বৃষ্টি। তোয়ালে শুকোয় না। কাঁথা শুকোয় না। ঘরে কচি বাচ্চা। কী বুড়ো রুগী। বারে বারে হেগে ফেলে। হিসু করে। কোথায় অতো টিস্যু। হাগিস। টুকরো টুকরো হই ধনেখালি আমি। পাতলা হয়ে আসা রঙ ওঠা আমি, কেমন হাগুমুতু সামলাই কচির, বুড়োর। শরীর শেষ হয়ে এলো, তবু যে প্রয়োজন ফুরোয় না। এটা ভেবে, কী যে ভালো লাগে!
রক্ত। রক্ত। রক্ত।
পশুবলির রক্ত। মানুষবলির রক্ত। কালো মানুষ। হলুদ মানুষ। লাল। নীল। সাদা। মানুষের রক্ত।
এককালে।
এক পুরনো পৃথিবীতে…
অত্যাধুনিক গজ তুলো ন্যাপকিন আসার আগে আমি-
পিউরিফায়ার ডিসটিলড ওয়াটারের আগে যেমন জল
ইঞ্জেকশন ক্যাপসুল বটিকার আগে যেমন জড়িবুটি ভেষজ শরীর পৃথিবীর-
কেমন আশ্রয়। আয়ুধ। উপশম। ছিল। নষ্ট হল। নষ্ট হয়।
ধরিত্র দোহন করে। হত্যার আমোদ মানুষের।
কালচক্রে বারো হাতের দীর্ঘ দেহের গৌরব ভেঙে কত ভাবে যে তৈরি হই। এক থেকে বহু হই। ছিন্নবিচ্ছিন্ন হই।
কাঁথা হই। হই বড়ি শুকনোর ন্যাকড়া। ন্যাকড়ায় ডাল বেঁধে জলে ফোটার সহিষ্ণুতা। আচমকা হাত কেটে গেলে কানি হয়ে রক্ত বেঁধে দেবার বিশল্যকরণী যেন !
কেমন চৌকো চৌকো করে টুকরো হই । তারপর তে কোনা হয়ে খুকুমনি, খোকামনির গুহ্যদ্বার জড়িয়ে হাগু সামলানোর ঘরোয়া পাঠ।
আবার আমি কখনও চৌকো ভাঁজ হয়ে লম্বা ফালির আমির মাঝখানে। এক হাত কাপড় নেংটির মতো করে পরার ম্যাজিক। গোপন পীঠ থেকে স্রোত যেখানে হড়হড়িয়ে নামে, সেখানে শক্ত বাঁধ চাই। তো কখনও নুড়ি, কখনও কানি- কখনও কাপড় মুড়ে মুড়ে কাঁঠাল কাঠের পিঁড়ির মতো তৈরি হই শক্ত আসন, ত্রিভুজ সতীপীঠের জন্য। আমার শক্তপোক্ত আগল দিয়ে যুবতী কইন্যারা সামাল দেয় চাপ চাপ যৌবন রক্ত স্রোত।
এ জীবন লইয়া কী করিব। কী করিব ! উন্মাদের মতো অভিযান প্রিয়তায় আর জীবন এক খোঁজের উদ্দামে খালাসিটোলায় কখনো- কখনো ৬ প্যাক উচ্চাশা- জুয়েলারি- শপিং মল- বাৎসরিক দেশ-বিদেশ আউটিং – ক্রিকেটের কুরকুরে চিবোতে চিবোতে দেশপ্রেমের উত্তেজনায় লুব্রিকেটেড মধুরাত তোমাদের ! এইসব বেকার খেলার বাইরে আছি নেই – মাত্র এই – মায়া ! বারো হাত বৈভব থেকে টুকরো কুচিকুচি ছিন্ন কাঁথা কানি ন্যাতা হয়ে ফুরিয়ে যাওয়ার সুখ। ‘ জীবনের ওঠাপড়া যেন গায়ে না লাগে’… মানুষের বিজবিজে স্বার্থপরতার বেকার পাঠক্রমের বাইরে টুকরো টুকরো আমি, আমরা… আমাদের গুহাচিত্র নেই। বর্ণমালা রাখিনি। লীন হয়ে যাই অনন্ত বিশ্বচক্রে…
যেভাবে গাছ। নদী। ইঁদুর। সাপ। পাথর। মাটি।
প্রতিমুহূর্তে অনন্ত মহাকাব্য লেখে।
মুছে দেয় …
স্লেটের হরফগুলি, মুছে যায়, নির্লিপ্ত ভেজা ন্যাকড়ায় …
বেকারে-সাকারে বাইরে-ভেতরে
উমাপদ কর
১
‘বেকার’ শব্দটা বাংলায় চালু হয়েছে ফারসি ভাষা থেকে। ফারসি একসময় আমাদের এই বড়ো দেশটার যোগাযোগের ভাষা ছিল। শব্দটার উৎস সময়কাল জানি না। কিন্তু আন্দাজ করি, যে সময়কালে সেই ভাষা দেশের যোগাযোগের ভাষা, দলিল-দস্তাবেজের ভাষা, তখন থেকেই শব্দটির প্রয়োজন পড়েছিল বাস্তব ক্ষেত্রে। ‘বেকার’ একটা বিশেষণ, যা চলজীবনে কিছু মানুষকে রেফার করে, যা তার ভূষণ, সে যে অর্থেই হোক। তো ভূষণের অলংকারগুলো দেখা যাক।
ক) কর্মহীন,
খ) জীবিকাহীন,
গ) নিরর্থক/অনর্থক,
ঘ) বৃথা/ফালতু,
ঙ) কর্মবিমুখ/ শ্রমবিমুখ।
ব্যাস, অন্তত হাতে-গলায়-কানে-আঙুলে-আর কপালে টিকলি ঝুলিয়ে এক কণে-কে সাজানো গেল। এবারে কণে-কে তোলা-তোলা করে না-রেখে, একটু জমিনে নামানো যাক।
ক) কর্মহীন মানুষ হয় না। নিদেন ঘুমায়-খায়-প্রাতকৃত্য সারে। এ-সবই কাজ। এবং কাজের কাজই। নয়তো মানুষ বাঁচে না, বাঁচবে না। কিন্তু যদি কর্মহীন বিশেষণটিকে ‘কাজ নেই যার’ হিসেবে দ্যাখা হয় তবে, উপরোক্ত কাজগুলোর বাইরের কাজকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কাজের কাজ যাকে বলা যায়। সেক্ষেত্রে এই অলংকারের (বালা বা চুরি) একটা দেখনাই বেরিয়ে আসে।
খ) এটা কণ্ঠের মালিকা। জীবিকা, যা জীবনযাপনের সমস্তরকম ফাই-ফরমাস খাটতে সক্ষম। পেশার দিক থেকে শব্দটি মানুষকে চিহ্নিত করে। আরেকটি নতুন শব্দ চলে এল—‘পেশা’। এও ফারসি শব্দ। বৃত্তি-ব্যবসায় বা জীবিকানির্বাহের পন্থা। তাহলে বেকার অর্থে পেশাহীন মানুষকেও বুঝব। কণ্ঠমালিকা বটে, কিন্তু ধাতুগত দিক থেকে বেকারের ক্ষেত্রে তা মূল্যহীন, এনামেলেরও না।
গ) কানে না-থাকলে কনে কে মানায় না। নিরর্থক বা অনর্থক কী-ই বা জীবনে! একটু কি দার্শনিক হয়ে পড়লাম? হবেও বা! ‘অর্থ দ্যায় না’, বললে অবশ্য একটা ‘মানি’ ‘মানি’ গন্ধ ছড়ায়, যা খুবই কাজের। কিন্তু যদি মানির বদলে একটু পালটে ‘মানে’ বলি তাহলে পেশার সঙ্গে সেভাবে যায় না। কানের ‘ঝুমকো’-টা নিমেষে নেহাৎ একটা ছোট্ট ‘টব’-এ পরিণত হয়ে যায়।
ঘ) আঙুলেরটা সত্যি বলতে কি ফালতুই। থাকলেও হয়, না-থাকলেও চলে। কিন্তু যদি ট্র্যাডিশনের কথা ভাবা যায়, তবে অশেষ মূল্য তার, ওই যাকে ‘অঙ্গুরীয় বিনিময়’ বলা হয় আর কি। তো ফালতু সব কিছুই হতে পারে। ফালতু মানুষ, ফালতু শ্রম, ফালতু কবি-সাহিত্যিক, মায় ফালতু পেশা পর্যন্ত। ফলে এই অলংকারের সঙ্গে বেকারের ফালতু সম্পর্ক টানা অনর্থক।
ঙ) রইল টিকলিখানা, কপাল জুড়ে। আর কে না জানে ‘কপালের নাম গোপাল’। খাটো খাও, শ্রম কর পারিশ্রমিক নাও। এতো খাটি কথা। কপাল তো খেতে-পরতে দেবে না। তাই ‘কর্মবিমুখ’ বা ‘শ্রমবিমুখ’ বিশেষণটি যার সঙ্গে জুড়ে যাবে, তার বেকার তকমাটি আর খাটে না। মানে, ‘মোটেই মা রাঁধে না, তপ্ত কি পান্তা!’ টিকলি এখানে অপ্রাসঙ্গিকই বিবেচিত হবে।
এই গেল বিশেষণটির বিশেষায়িত করার তরিকা। যার মধ্যে ‘খ’ আমাদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ প্রযোজ্য। আর আংশিকভাবে ‘ক’ আর ‘গ’। হাতে-কানে-গলায় হলেই চলবে কণের সাজ।
বেকারের বিপরীত শব্দ ‘সাকার’-ও একটি বিশেষণ, স্বভাবতই; যা রেফার করে উপরোক্ত সবগুলো অবস্থানের মানুষের বিপরীত দিকটি। এখানে কণে-সাজটি বা ভূষনগুলো গ্লোরিয়াস। এখানে আর বিষদে যাওয়ার দরকার দেখি না। বরংচ এই শব্দ-দুটোর ‘পূর্ণ’তার বিষয়টি নিয়ে কথা বলি। বলতে চাইছি, ‘পুরো বেকার’ বা ‘পুরো সাকার’। আবার একইসঙ্গে ‘অংশত বেকার’ বা ‘অংশত সাকার’। জীবন চালাতে জীবিকার প্রয়োজন। যেমন, লাট্টুকে ঘূর্ণায়মান রাখতে লেত্তি, ঘড়িকে সচল রাখতে স্প্রিং-এ দম বা ব্যাটারি। তো, ‘পরিপূরকতা’র একটা পরিসর গড়ে ওঠে। এই পরিসরে ঘাটতিই সংকট ডেকে আনে, যা আদিকাল থেকে মানবসভ্যতাকে টিটকিরি মেরেই চলেছে। কাল নিরপেক্ষ নয় পরিপূরকতার পরিসরে এই ঘাটতিটা। সময়ের সঙ্গে একটা দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক আছে এর।
২
নিবন্ধের পরিসরের কথা চিন্তা করে আমাদের একটা বেস-পয়েন্ট ঠিক করে নিতে হবে। কারণ যেদিন থেকে মানুষের প্রাথমিক চাহিদাগুলো (খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান-স্বাস্থ্য-শিক্ষা) মেটানোর প্রশ্ন উঠল, সেদিন থেকেই জীবিকা বা পেশা একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নিল তার জীবনে। এই সংকট, অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেও মানুষ বেঁচে ছিল, আছে এবং থাকবেও। এরকমভাবে বললে আবারও একটা দার্শনিকতা এসে হাজির হয়। হাজির হয় এক ধরনের উদাসীনতাও। সেটা এই নিবন্ধের সঙ্গে খাপ খায় না। তাই বাস্তবভিত্তিতে চাহিদা, সংকট, সংকুলানকে দেখা দরকার। আমরা গভীরতা, তীব্রতা, আর গুরুত্বের নিরিখে সময়কালের দৈর্ঘ্য এবং পরিসরের ব্যাপ্ততাকে ছোট করে আনি প্রথমে। তাই কাল হিসেবে ২য় মহাযুদ্ধ ও তার পরের সময় (সেটাও প্রায় ৮০ বছর) আর পরিসরের দিক থেকে ভারতবর্ষ ও পরে ভারতকেই (স্থলভূমির দিক থেকে এই গ্রহের প্রায় ২.৪ শতাংশ আর লোকসংখ্যার দিক থেকে পৃথিবীর প্রায় ১৭.৫ শতাংশ) এই নিবন্ধে নিয়ে এসে আলোচনাটা চালাই।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে ভিত্তিভূমি ধরার একটা কারণ আছে। ব্রিটিশ রাজ-শক্তির পরাধীন ভারতবর্ষ যুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংযুক্ত না-হলেও, পরাধীন হিসেবেই ছিল ‘মিত্র-শক্তি’-র পক্ষে। যুদ্ধের ফলস্বরূপ সারা বিশ্বে যে ওলটপালট হয়েছিল, সামাজিক ও অর্থনৈতিক যে প্রভাব পড়েছিল তার রেশ ভারতবর্ষের মানুষের জনজীবনকেও যথেষ্ট প্রভাবিত করেছিল। এই ওলটপালটে ভেঙে যায় অনেক পুরোনো সংস্কৃতি। ভেঙে যেতে শুরু করে একান্নবর্তী পরিবার। বেকারি বাড়ে, বাড়ে অন্নচাহিদা। সৈন্যদলের জন্য প্রভুত খাদ্যভাণ্ডার মজুত করায় সাধারণে বাড়ে খাদ্যাভাব। জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। মানুষের মানবিক মূল্যবোধের ওপর একটা কালো মেঘ এসে জমে। দু-দুটো পারমনবিক বোমা হত্যা করে মানবিকতার প্রাণ-ভোমরাটিকে, আর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষমতা আর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ধর্ষণ করে সভ্যতার নাবালিকাটিকে। আতংক জাগিয়ে তোলে সাধারণে, হত্যা-ঋণ পরিশোধের দায় এসে ব্যতিব্যস্ত করে চ্যালেঞ্জ জানায় নিরাপত্তাকে। একই সময়ে ১৯৫০ পর্যন্ত ভারতবর্ষে ঘটতে থাকে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনারাজি। ভারতের পূর্ব-সীমান্তে নেতাজীর আজাদহিন্দ বাহিনী নিয়ে মিত্র-শক্তিকে আক্রমণ, অক্ষ-শক্তির সহায়তায়। অক্ষশক্তির তুমুল পরাজয়। নেতাজীর মৃত্যু/হত্যা কিংবা কর্পূর হওয়া। ১৯৪২-এ গান্ধীজির আহ্বানে ‘করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে’ নাড়ায় ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন ও তার তীব্রতা, মাঝেমধ্যেই যা অহিংসনীতিকে পাশে সরিয়ে রাখতে বাধ্য হয়েছে। ইংরেজের বোধোদয়— এবার পাততাড়ি গুটিয়ে উপনিবেশ ছাড়তে হবে। ছাড়তে যখন হবেই, তবে দুর্যোগের ঘনঘটা লাগাতে, কমিশন-মিশন-বৈঠক-আলোচনা; স্বাধীনতার মোয়া হাতে ধরানোর বিনিময়ে মানচিত্রে ছুরি, দেশীয় রাজনৈতিক দলগুলির নিজস্ব জিগির, রাজি-অরাজি-রাজি। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হত্যা/খুন-মহাত্মাজি, দেশভাগ-উদ্বাস্তু-হাহাকার-শিবির-নরকজীবন-স্বাধীনতা। ক্ষমতার হস্তান্তর। পাওয়া গেল নিস্পেষিত ছিবড়ে ভারতবর্ষ, বিশেষত অর্থনৈতিক অবস্থানে। শস্যশ্যামলা দেশ খাদ্যসংকটে। সোনা-রূপা-মণিমানিক্য-ময়ূর সিংহাসনের দেশ ভিক্ষাকে একটা বৃত্তি হিসেবে নিল। মুক্তিকামী অহিংস-সহিংস প্রণালীতে লড়া মানুষ অনেক সময়েই পেছনের সারিতে চলে গেল, সামনে এসে গেল ইংরেজ তোষণকারি-স্তাবক-পা চাটা-মুচলেখা দেওয়া ক্ষমতাভোগীর দল। এল যুদ্ধ, পশ্চিম সীমান্তে। এল খুন, গান্ধিজির চিরঘুম, এল সাম্প্রদায়িক শক্তির বাঁটোয়ারা। এল দেশীয় সংবিধান, পার্লামেন্ট-অ্যাসেমব্লি-পুরোনো আইনের সামান্য রদবদল। এল নির্বাচন, স্থাপিত হল সরকার। এবার দেশ গড়া। গড়া তো বটেই, কী দিয়ে, কীভাবে, কী পদ্ধতিতে? প্রশ্নটা আপাতত থাক। আমরা বৃক্ষের ফল দেখে চিনে নেব।
বলতে চাইছি স্বাধীন ভারতে বেকারত্বের স্বাদ-পাওয়া মানুষ যে থাকবে এবং বাড়তেও পারে তার বাস্তবভিত্তিটা কিন্তু আগেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল। বিশেষত তিন-চারটি রাজ্যে, যার মধ্যে একটা পশ্চিমবঙ্গ। খুব তাড়াতাড়িই আমি একবিংশ শতাব্দীর দিকে ধেয়ে যাব, কেননা গত কুড়ি বছরটাই হবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। এইসময়কালের মধ্যে ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের অবস্থাটা আমরা দেখতে চাইব নানা দৃষ্টকোণ থেকে। এখানে ধরতাই হিসাবে পরপর কিছু উল্লেখযোগ্য ভাবনা-কার্যক্রম-রূপায়ন এসব নিয়ে কথা বলে যাব। দেশে নির্বাচন, কংগ্রেস সরকার, শীর্ষে জহরলাল। ভাবনা পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, কমিশন, শীর্ষে প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবীশ। মিশ্র অর্থনীতি গ্রহণ। সরকারি উদ্যোগ ভারী-শিল্পে, সহায়ক সোভিয়েত রাশিয়া, সমাজতান্ত্রিক ব্লক। যাতে ইনভেস্টমেন্ট বেশি, রিটার্ন দেরিতে, যেখানে বেসরকারি উদ্যোগপতিরা নিরুৎসাহ, সেখানে সরকারি উদ্যোগ। ট্রেন (যোগাযোগ ও পণ্যপরিবহন), বিদ্যুৎ (কলকারখানা ও নগরায়ণ)। লোহা, ইস্পাত, বাঁধ-সেচ-বিদ্যুৎ, সার, যন্ত্রপাতি, ইত্যাদি তৈরির কারখানা, দেশের অনেক জায়গায়। পশ্চিমবঙ্গ তখন বেকারিতে ধুঁকছে। উদবাস্তরা অধিকাংশই বেকার। সম্পদ ছেড়ে বেশিরভাগই খালি হাত-পায়ে চলে আসতে বাধ্য হয়েছে। ব্যক্তি উদ্যোগে কিছু মানুষ পেশায় যুক্ত হলেও তা ভরণ-পোষণের দায় মেটাতে পারছে না। বলা যায় অর্ধ-বেকার। অধিকাংশই, শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে বেকার। মুখ্যমন্ত্রী বিধান রায়। বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ। দুর্গাপুর শিল্পনগরী। ডিভিসি, ডিপিএল, স্টিল-প্ল্যান্ট, এম-এ-এম-সি, আর এলায়েড ইন্ডাস্ট্রি। কল্যানী কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (পড়াশোনা ও কৃষি গবেষণা)। হরিণঘাটা দুগ্ধ প্রকল্প। সল্টলেক সিটি নির্মাণ। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়, চিত্তরঞ্জন লোকোমেটিভ। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, দক্ষ-অদক্ষ বহু মানুষের পেশা জুটল, বেকারত্ব ঘুচল। সবচেয়ে উপকৃত হল উদবাস্তুরা। সমস্যা অনেকটা মিটেও ফুরোলো না। ধিকিধিকি চলতেই থাকল। দেশে দেশীয় উদ্যোগপতিরা কিছু কলকারখানা গড়লেন। বিদেশি বিনিয়োগও ঘটল কিছু। কিন্তু তা বেকারির সব সংখ্যাকে মুছে দিতে পারল না। এরমধ্যে দেশ দু-দুটো যুদ্ধ সামলাতে বাধ্য হলো। ১৯৬২-র চীন-ভারত যুদ্ধ আর ১৯৬৫-র ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। অবস্থা সামলাতে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়াতে বাধ্য হলো সরকার। সরকারি উদ্যোগে লগ্নি গেল কমে। লোকসংখ্যায় পাহাড়ের খাড়াই বাড়তে লাগল। ১৯৬৯-এ প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরাগান্ধী আরও দুটি সমাজতান্ত্রিক পদক্ষেপ নিলেন। এক, রাজন্যভাতা বিলোপ; দুই চোদ্দটি বড়ো ব্যাংকের জাতীয়করণ। দেশে, হৈ-হৈ রব পড়ে গেল। আঘাতপ্রাপ্ত মনোপলি হাউস ও তাদের অঙ্গুলিহেলনে চলা রাজনৈতিক দলগুলো রৈ-রৈ করে সুপ্রিমকোর্টের দরজা খটখটালো, যদিও তা খাটলো না। সংবিধান সংশোধন করে একে মান্যতা দেওয়া হলো। এতে একটা আলোড়ন পড়ল। ব্যাংকিং ব্যবস্থা বিস্তার লাভ করতে শুরু করল। নিয়মবিধি পরিবর্তনের ফলে কৃষিক্ষেত্রে আমানতের ৬ এর বদলে ১৪ শতাংশ ঋন দেবার ব্যবস্থা হলো। অগ্রগন্য ক্ষেত্রে আমানতের ৪০ শতাংশ ঋন দেওয়া শুরু হলো। এতে ‘সবুজ বিপ্লবের’ সূচনা হলো বলা যায়। আরেকটা ঘটনাও ঘটল, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রচুর শিক্ষিত ও স্বল্প-শিক্ষিতের বেকারত্ব ঘুচল। একইভাবে ঘটনাটা ঘটলো বীমা ক্ষেত্রেও। সাধারণ ও জীবনবীমা। প্রায় একইসঙ্গে ভারত আরেকটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল (১৯৭১ এর ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ, উভয় সীমান্তে)। ফলশ্রুতিতে আরেকবার উদবাস্তু সমস্যায় পড়ল মূলত পশ্চিমবঙ্গ। অর্থনীতির বেহাল অবস্থা মেটাতে ইন্দিরা গান্ধিকে থলে নিয়ে বেরিয়ে পড়তে হলো বিদেশি সাহায্য কুড়োতে। আর পশ্চিমবঙ্গে একদফায় জনসংখ্যা বেড়ে গেল প্রচুর।
রাজনৈতিক কারণে ১৯৭৫-এ ইমার্জেন্সি ঘোষণা করলেন ইন্দিরা গান্ধী। ফলশ্রুতিতে দেশে প্রথম অকংগ্রেসি সরকার ১৯৭৭-এ। টিকল না বেশিদিন। ১৯৮০-তেই ইন্দিরা গান্ধীর প্রত্যাবর্তন। জনসংখ্যার অভূতপূর্ব স্ফিতীতে, তরুণ নেতার পরামর্শে দেশে চালু হলো ‘হাম দো হামারা দো’ স্লোগানের প্রয়োগ। সুফল মেলারই কথা। কিন্তু রাজনৈতিক টানাপোড়েন, ধর্মীয় জিগির, আর জোর-জবরদস্তির ফলে বিষয়টা বিষময় হয়ে উঠল। এই সময় পশ্চিমবঙ্গে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে বামফ্রন্ট সরকার। পশ্চিমবঙ্গে তখন বেকার দশার নাভিশ্বাস। গ্রামাঞ্চলে করা হলো ভূমিসংস্কার, যার কিছু সুফল সাধারণে মিলল। কিন্তু বেকার কমেও কমল না। একসময় সরকার নিজেই চালু করল বেকার-ভাতা। বেকার বলে এক ধরনের স্বীকৃতি। দশকের শেষদিকে রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বে মনমোহন সিং-এর পরামর্শে বাজার অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হলো দেশ। তাতেও বেকার সমস্যার যে সুরাহা হলো, তা নয়। নয়া টেকনোলজি আর L-P-G (Liberalisation, Privatision, Globalisation) নীতি গ্রহণের ফলে দেশে বেকার সমস্যা সমাধানের বিপরীতে তাকে আরও কঠিন করে তুলল। নয়ের দশকে এসে অবশ্য আই-টি ক্ষেত্রে বহু নিয়োগের সুবিধা বাড়লো। যদিও রেল পোস্টাফিস বা পাব্লিক সেক্টরে কর্মী নিয়োগ বন্ধ হয়ে গেল। ফলে অবস্থার তেমন হেরফের ঘটলো না। নয়ের দশক চলল নানা টানা-পোড়েনে। বিশ্ব ইউনিপোলার হলো। অর্থনৈতিক দিক থেকে সাবলীল ধনতান্ত্রিক দেশগুলোর মাতব্বরি, খবরদারি বেড়ে গেল। দেশে মিশ্র-অর্থনীতি না উদার-অর্থনীতি তা নিয়েও চলল তর্ক-বিতর্ক লড়াই। বেকারের সংখ্যা বাড়ল বই কমল না। এইরকম একটা প্রেক্ষিতে একবিংশ শতাব্দীর উদয়, যা নিয়ে আমরা মূল আলোচনায় প্রবেশ করব।
(এখানে ১৯০১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত সময়কালকে অনুভূমিক (Horizental) এবং মোট লোক-সংখ্যাকে (0000 omitting) লম্বভাবে (Vertical) রেখে একটা রেখাচিত্র বা গ্রাফ রাখা হলো। এতে একটা ধারণা পাওয়া যাচ্ছে দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির অবস্থানটা।)
ফেসবুকে তোমাদের করা চারটি পোস্টের এক জায়গায় বলা হয়েছে— “বেকার সংখ্যায় আমরা লেখায়, রেজাল্ট এর চিত্রায়ণ চাইছি না, চাইছি কারণকে চালক বানাতে।” ঠিকই। ফল নয় কারণ, কিন্তু ঘটে যাওয়া ঘটনার নীতি-প্রয়োগ-ফল ইত্যাদির সঙ্গেই অঙ্গাঙ্গি জড়িয়ে কারণগুলো। তাই কারণ খুঁজতে গেলে কিছু অতীত চিত্রায়ণ আবশ্যক হয়ে পড়ে। এই যেমন ওপরে একটা গ্রাফ তুলে আনলাম। এখানে কি বেকারত্বের কারণ লুকিয়ে নেই? অবশ্যই আছে। সময়কালের প্রেক্ষিতে দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির গ্রাফটি ক্রমে খাড়াই থেকে খাড়াইতর হচ্ছে, যার সঙ্গে বেকার এই শব্দটির প্রত্যক্ষ সংযোগ রয়েছে।
ভৌগোলিক দিক থেকে বিশ্বের ভূ-ভাগের ২.৪ শতাংশ ভারতের অধিকারে (৩২,৮৭,২৪০ বর্গ কিমি)।কিন্তু বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ১৭.৫ শতাংশ ভারতে বাস করে। এ-কথা ঠিক আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিলে বিশ্বে চাষযোগ্য জমির পরিমান ভারতেই বেশি। আবার কানাডা ও আমেরিকাকে বাদ দিলে বিশ্বে ভারতের জলভাগই বেশি। কিন্তু কর্মসংস্থানের দিক থেকে এই পরিসংখ্যান আশাব্যঞ্জক নয়। কারণ, স্থলভাগ-জলভাগ স্থির, বাড়ছে মোট জনসংখ্যা, তার হার কমলেও।এর ওপর আছে আভ্যন্তরীণ বিধিব্যবস্থা, যা একটা শ্রেণীকে খেয়ালে রেখে বহাল এবং অসম বন্টন, যা কর্মসংস্থানের বিষয়টিকে জটিল থেকে জটিলতর করে তুলছে।
এখানে আমরা আলোচনাটা করব ২০০১, ২০১১, এবং বর্তমান সময় তথা ২০২০-র প্রোজেক্টেড) আদমসুমারির ও অন্যান্য তথ্যগুলো সামনে এনে। নীরস তথ্যের একটা তালিকা, প্লিজ হতাশ হবেন না, এখান থেকেই আমাদের বাস্তবিক অবস্থানের ওপর দাঁড়াতে হবে।
ভারতঃ- (তালিকা-১)
(মার্চ পর্যন্ত)
ভারতঃ- (তালিকা-২)
(ডিসেম্বর পর্যন্ত)
তালিকা-১ থেকে দেখা যাচ্ছে ২০০১ সালে ভারতে মোট জনসংখ্যার ৭২.২ শতাংশ মানুষ বাস করত গ্রামাঞ্চলে। বাকি ২৭.৮ শতাংশ মানুষ শহরাঞ্চলে।
একইভাবে ২০১১ সালে এই হার যথাক্রমে- ৬৮.৮ শতাংশ ও ৩১.২ শতাংশ।
প্রথমেই যেটা উল্লেখনীয় গ্রামে অধিকাংশ ভারতবাসী বাস করে। অর্থাৎ এই যে বলা হয় গ্রামীন-ভারত তার একটা আলাদা তাৎপর্য আছে। মানুষ বেশি, কর্মসংস্থানের প্রয়োজনও সেখানে বেশি হওয়াই স্বভাবিক। কিন্তু তা-কি হয়? গ্রামীন মানুষের অর্থনীতির বনিয়াদ কী? নিঃসন্দেহে কৃষি। সেখানে পেশা কী কী? চাষবাস, দিনমজুর (কৃষি, ঘরামি, বা অন্য), বাড়িতেই কুটির বা অতি-ক্ষুদ্র-শিল্প (কর্মকার, কুমোর, তাঁতী, ছুতার, দোকানদার, ফেরিওয়ালা, অন্যান্য)। কৃষিশ্রমিক ও দিনমজুরদের বছরে সবসময় কাজ থাকে না। তাহলে তারা পূর্ণ সাকার নয়। বলা যায় আংশিক-বেকার। আবার এই কৃষিকাজ ও কষিজাত-পণ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে ছোটো-বড়ো অনেকরকমের কল-কারখানা, যা মূলত শহরঞ্চলেই অবস্থিত। একে এলায়েড এগ্রিকালচারাল ইন্ডাস্ট্রি বলা যায়। যেমন- সার-কারখানা, ট্রাকটার নির্মাণ কারখানা, পেস্টিসিডস তৈরির কারখানা, রাইস-মিল, ফ্লাওয়ার মিল, তেল তৈরির ঘানি, ফুড প্রসেসিং কারখানা, কোল্ডস্টোরেজ ইত্যাদি। এতে শ্রমিক প্রয়োজন। তৈরি হয় শ্রমদিবস। সুতরাং বলা যায়, কৃষিকেন্দ্রিক কর্মসংস্থান শহরাঞ্চলেও ঘটে। আবার ১০ বছরে যে গ্রামে বসবাসকারির সাংখ্যহার (৭২.২-৬৮.৮= ৩.৪ শতাংশ) কমে গেল, তার কারণ মূলত দুটো। এক, গ্রামাঞ্চলের কিছু অংশ শহরাঞ্চলে রূপান্তর (কিছু ক্রাইটেরিয়ার প্রেক্ষিতে); দুই, গ্রামে কর্মসংস্থানের অভাবে মানুষের শহরাঞ্চলে গিয়ে কাজ করে জীবন ধারণের বাস্তব প্রবণতা। কিন্তু শহরাঞ্চলেই বা সেভাবে কাজ কোথায়? আরেকটা বিষয় উঠে আসছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে প্রতি বর্গকিমিতে জনঘনত্বও বেড়ে যাচ্ছে। গ্রামে চাষযোগ্য ভূমি সেভাবে বাড়ছে না, অথচ ১০ বছরে গ্রামে জনঘনত্ব বাড়ছে (৩৮২-৩১৩)=৬৯জন প্রতি ১০০০-এ। ফলে কর্মসংস্থান গ্রামে আরও সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
তালিকা-১ থেকে আরও একটা বিষয় পরিস্কার ভারতে স্বাক্ষরতার হার বাড়ছে। যদিও স্বাক্ষর বলতে কোনোমতে নিজের নামটাকে এঁকে দেওয়ার বিষয়টি জড়িত। তবুও জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং একইসঙ্গে স্বাক্ষরতার হার বৃদ্ধিতে এটা অন্তত বোঝা যায় অ্যাকাডেমিক শিক্ষাতেও শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা ভালোই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই ধরনের তরুণ-তরুণীর জন্য এমন কর্মসংস্থান প্রয়োজন হয়ে পড়ছে যেখানে কায়িক শ্রমটা নগন্য। কিন্তু কৃষি-নির্ভর দেশে গ্রামাঞ্চলে সেই কর্ম-সংস্থানের সুযোগ নেই বললেই চলে। চাপটা চলে আসছে শহরাঞ্চলে, সেখানেও স্যাচুরেশন শেষে উদ্বৃত্ত। ফলে বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, বার্ষিক হার-কে কাছাকাছি রেখে। দেশের বাইরে কাজের সন্ধানে পাড়ি জমাতে হচ্ছে শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে।
তালিকা-২, খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে দেখা যাচ্ছে ভারতে বিভিন্ন এজ-গ্রুপের মানুষের সংখ্যার হার, এবং গড় আয়ু। তালিকা থেকে এটা পরিস্কার যে ১৫-৬৪ বছর মানুষের হার সবচেয়ে বেশি, শধু বেশি নয়, বাকি দুটির যোগফলেরও প্রায় দ্বিগুণ। আর এই এজ-গ্রুপটাই কর্মসংস্থানের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এই এজ-গ্রুপই নির্ধারণ করছে ভারতের মোট ওয়ার্কিং ফোর্স। ২০২০ সালে এটা প্রত্যাশিত যে ভারতে Median Age হবে ২৯ বছরের কাছাকাছি। আমাদের মনে রাখতে হবে এই গড়-বয়সটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই বয়সটার আগে ও পিছে ৫ বছর বিয়োগ ও যোগ করে যে সংখ্যাটা দাঁড়াবে বস্তুত তারাই কর্মসংস্থান প্রত্যাশী। এখানেই সাকার শব্দটি কিছুটা তৃপ্তির স্বর যেমন তুলছে, তেমনি এখানেই লুকিয়ে আছে বেকার, আধাবেকার শব্দগুলোর হাহাকার আর যন্ত্রণা। নিঃসন্দেহে এর মধ্যে শিক্ষিত ও অশিক্ষিত দু-রকমের যুবা-যুবতীরাই আছেন। পৃথিবীর অনেক দেশেই এই Median Age ভারতের চেয়ে অনেক বেশি। এখন এই প্রোডাক্টিভ ফোর্সকে কীভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে সেটাই রাষ্ট্র-সমাজ-অর্থনীতির কাছে বড়ো চ্যালেঞ্জ। গড় আয়ু সামান্য হলেও বৃদ্ধি পাচ্ছে, এবং ২০২০ সালে তা ৭০ (প্রোজেক্টেড)বছর ছোঁবে। ‘নাই মামার চেয়ে কানামামা ভালো’ এই আপ্তবাক্যে বিশ্বস্ততা বেড়ে স্যাচুরেটেড হয়ে যাওয়া কর্মসংস্থান-স্থলে বেকাররা বাধ্য হচ্ছে আধা কিংবা ওয়ান-থার্ড শ্রম-মজুরিতে কাজ করতে। কম্পিটিশনের গুড় খেয়ে এক শ্রেণী স্ফীত আরেক শ্রেনীর অসাহয়তাকে কেন্দ্র করে।
তালিকা-২ থেকে দ্যাখা যাচ্ছে, ২০০১ সাল থেকে বেকারত্বের হার সামান্য কমছে বা বাড়ছে। এই কমা বাড়ার মধ্যে একটা স্ট্যান্ডার্ড এরইমধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, সেটা ২.৬৫ শতাংশ ভারতের মোট জনসংখ্যার ওই (১৫-৬৪) এজ-গ্রুপের । আর ২০১৯ এর ডিসেম্বরে পার্সেন্টেজটা যদি ২.৫৮-ও হয়, তবে মোট জনসংখ্যার নিরিখে কর্মক্ষম মানুষের ভিত্তিতে বেকারের সংখ্যাটা দাঁড়ায় – ৩ কোটি ৫৫ লক্ষের ওপর। বেকারত্বের হারের পাশে * চিহ্নটি কেন, তা জানানো দরকার। এই দুই তালিকা বাদে এরপরে যদি সরকারের মূল সার্ভে সংস্থা NSSO-র (National Sample Survey Office) রিপোর্ট, একইসঙ্গে ILO (International Labour Organisation) রিপোর্ট, Labour Bureau Report (The Indian Labour Bureau), CMIE Report, World Bank’s Report –ইত্যাদি অনুসরণ করা যায়, যা একটা ভূমিকা পালন করে, তাহলে এই দেশের বেকারত্বের অবস্থানটা অনেকটাই পরিস্কার হয়। কিছু উদ্ধৃত করা যাক।
A)“According to the Indian government's official statistics between the 1980s and mid 2010s, relying in part on the NSSO data, the unemployment rate in India has been about 2.8 percent, which states the World Bank, is "a number that has shown little variation since 1983". In absolute terms, according to the various Indian governments between 1983 and 2005, the number of unemployed persons in India steadily increased from around 7.8 million in 1983 to 12.3 million in 2004–5. According to the World Bank, these official Indian government "low open unemployment rates can often be misleading" and the official data does not reflect the unemployment and under-employment reality of the Indian population.”
B) “For decades, the Indian governments have used unusual terminology and definitions for who it considers as "unemployed". For example, "only those people are considered unemployed who spent more than six months of the year looking for or being available for work" and have not worked at all in the formal or the informal sector over that period. Alternate measures such as the current weekly or daily status unemployment definition are somewhat better. Using the current daily status definition, the unemployment rate in India had increased from "7.3 percent in 1999–2000 to 8.3 percent in 2004–5", states the World Bank report.”
C) “According to this report, (NSSO) the 2017–2018 "usual status" unemployment rate in India at 6.1%, a four-decade high, possibly caused by the 2016 demonetisation of large banknotes intended to curb the informal untaxed economy.” (Not published officially).
আশা করা যায় আলোচনায় দেশের বেকারের বর্তমান অবস্থা এবং তার বেশ কিছু কারণ উঠে এল। এই পর্যায়ে সর্বশেষ যে বিষয়টা তুলে ধরতে চাই, তা হলো বিগত দু-তিন বছরের আর্থিক মন্দার সঙ্গে বেকার বনে যাওয়ার যে প্রবণতা আমরা খেয়াল করছি তার সঙ্গে নতুন করে আরেকটা অবস্থান্তর ঘটছে এবং আরও বেশ কিছুদিন ঘটতেও থাকবে। সেটা হলো কোভিদ-১৯ মধ্যবর্তী অবস্থান এবং কোভিদ-১৯-উত্তর অবস্থান। ক্রমাগত লক্ডাউন- সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তায় ভারতের কর্মসংস্থান ও বেকারত্বের জগত যে সমস্ত স্পেকুলেশন তছনছ করে একদম ভিন্ন এক রূপ নেবে, এবং তা যে ঋণাত্মক দিকে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কত কর্ম-যুক্ত মানুষ যে কর্মহীন হয়ে পড়বেন, তা এখনই বলা অন্তত আমার পক্ষে কঠিন। এই কর্মহীনরাই বেকারত্বের বোঝাটা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে, এবং তার মোকাবিলা কোন পথে তার দিশা আমরা এখনও সেভাবে দেখতে পাচ্ছি না। আরেকটি বিষয়ও এই কোভিদ-১৯-এর সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িয়ে। সেটা হলো প্রবাসী বা অভিভাসী শ্রমিকদের সমস্যা (যাদের পরিযায়ী শ্রমিক বলা হচ্ছে)। মূলত আনঅর্গানাইজড সেক্টরেই এদের কাজ কারবার। তারা এই সময়ে যে কষ্ট-নিরাপত্তাহীনতা-খাদ্যাভাব-পশুবৎ জীবন-যাপনের মধ্যে রয়েছেন এবং জীবন বিপন্ন করে (অনেকে মৃত) ঘরে ফেরার মরিয়া চেষ্টা করে চলেছেন, এবং শেষাবধি প্রাণসম্বল ঘরে ফিরছেন, তাদের কতজন আগামীদিনে আবার কাজে ফিরবেন তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ ঘনিভূত। ফলে এদিক দিয়েও বেকারত্বের সংখ্যা বাড়ার এক প্রবল সম্ভাবনা। আবার রাষ্ট্র, রাষ্ট্রীকৃত সংস্থাগুলোর যেভাবে বিলগ্নিকরণ করে চলেছেন, (ব্যাংক-বীমা-আংশিকভাবে রেল-বিমান-বি-এস-এন-এল-কয়লাখনি), তা প্রাইভেট সেক্টরে গেলে যে আরও কর্মীসংকোচন হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সুতরাং, সব কারণগুলো মিলিয়ে বেকারত্ব এক এভারেস্ট ছোঁয়ার অপেক্ষায় আগামী কিছুদিনে।
পঃ বঙ্গঃ- (তালিকা-১)
পঃ বঙ্গঃ- (তালিকা-২) (এই তালিকাটা একটু বদলাতে হলো। কারণ, ভারত আর পঃবঙ্গে বয়স-ভিত্তিক মানুষের শতাংশ, গড় আয়ু, এগুলো অলমোস্ট একই। ১-২ শতাংশের পার্থক্য। তাই সেগুলো তুলে না ধরে রাজ্যের ওয়ার্কার-ননওয়ার্কের বিষয়টা নিয়ে এলাম।)
একইভাবে আমরা পশ্চিমবঙ্গের তালিকাদুটো অনুসরণ করলে যে বিষয়গুলি উঠে আসে, তা সংক্ষেপে এইরকমঃ=
ক) ভারতের ২.৭০ শতাংশ স্থলভাগ নিয়ে দেশের প্রায় ৮ শতাংশ মানুষের বাস এই রাজ্যে। ফলে মোট আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যা বেশি (ভারতের গড়ের তুলনায়ও), যা বোঝাও যাচ্ছে জনঘনত্বের পরিমান দেখে, যা আবার ভারতের গড়ের তুলনায় অনেকটাই বেশি।
খ) পশ্চিমবঙ্গে স্বাক্ষরতার হার বেশি ভারতের স্ট্যান্ডার্ড নিরিখে। বলা যায় এখানে শিক্ষিতের সংখ্যা যেমন বেশি, তেমনি শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাও বেশি। এটা প্রায় প্রথম থেকেই। এর মূল একটা কারণ আছে ঔপনিবেশিক যুগে বাংলায় কেরানি তৈরির প্রয়াস অনেকটাই সফল হয়েছিল, এবং তার লিগ্যাসি এখনও সে বহন করে চলেছে সংখ্যাধিক্য বাড়িয়ে। কিন্তু সংস্থানের ক্ষেত্র সেভাবে বাড়েনি। ফলে হাহাকারটা বেশি। বানিজ্য বা অন্য কর্ম-ব্যবস্থার দিকে বাঙালী তেমন ঘেঁষেনি। সহজ পন্থাটাকেই অনুসরণ করে চলেছে। গত দশ-বারো বছরে বিষয়টায় অবশ্য কিছুটা তফাৎ নজরে আসছে।
গ) পশ্চিমবঙ্গে শহরাঞ্চলের জনঘনত্ব অনেক বেশি। ফলে এই অঞ্চলের কর্মসন্ধানীর সংখ্যাও বেশি। অর্থাৎ গ্রামে কর্মসংস্থানের সুযোগ ক্রমেই কমে আসছে।
ঘ) তালিকার নন-ওয়ার্কারদের মধ্যে ১-১৫ বছর বয়সের মানুষরা যেমন আছেন, তেমনি আছেন ৬৪-উর্ধ্ব মানুষ। তবুও বেকারের শতকরা হার পশ্চিমবঙ্গে ক্রমান্বয়ে বেশ বেশি ভারতের গড়ের তুলনায়।(২০০১- বেকারত্বের হারে *চিহ্নের অর্থ হলো, এমপ্লয়মেন্ট-আনএমপ্লয়মেন্ট সার্ভে অনুসারে এই হার ৪.৯%)।
ঙ) প্রতি হাজার পুরুষে পশ্চিম বঙ্গে মহিলার সংখ্যা ভারতের গড়ের চেয়ে বেশি হলেও মহিলা-ওয়ার্কারের সংখ্যা যথেষ্ট কম। যেটা ভাবনার কারণ।
চ) একসময় কলকাতকে ঘিরে গঙ্গার দু-পারে গড়ে উঠেছিল অনেক শিল্প, কল-কারখানা। সেসব বিগত বেশ কয়েকবছর ধরেই, হয় বন্ধ নয়তো বন্ধ হতে চলেছে। শিল্প-নগরী দুর্গাপুর-আসানসোল-বরাকরের অবস্থাও তথৈবচ। ফলে তালিকা অনুসারে বেকারত্বের হার ক্রমবর্ধ্মান।
ছ)পশ্চিমবঙ্গে প্রবাসী বা অভিভাসী শ্রমিকের তুলনামূলক অবস্থানে কোনো ব্যালেন্স নেই। অর্থাৎ পঃবঙ্গ থেকে আনঅর্গানাজ়ইড সেক্টরে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকের সংখ্যা, অন্যান্য প্রদেশ থেকে এখানে আনঅর্গানাইজ়ড সেক্টরে কাজ করতে আসা শ্রমিকের তুলনায় অনেক অনেক বেশি। করোনা-প্রভাবে এরা ফিরে আসছে। আদৌ আর যাবে কিনা, তা-নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই গ্রামাঞ্চলের দিকে বেকারত্বের সংখ্যা অত্যধিক বেড়ে যাবে আগামীদিনে।
জ) শুধু কৃষিকর্মের ওপর নির্ভরতা আর চলছে না। এদিকে নতুন কলকারখান হদিশ নেই। শিল্প স্থাপিত হলে শিক্ষিত-অশিক্ষিত দুই ধরনের বেকারদেরই কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকে। বিগত বেশ কিছু বছরে পশ্চিমবঙ্গে সে গুড়ে বালি। উলটে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কারখানা, যা অধিক চিন্তার কারণ।
ঝ) শিক্ষিত বেকারদের, বিশেষত আই-টি সেক্টরের, অধিকাংশকেই পাড়ি জমাতে হচ্ছে অন্য রাজ্যে বা বিদেশে। এদিকে বিশ্ব জুড়েও চলেছে আর্থিক মন্দা। তার প্রভাব এসে পড়ছে এই শ্রেণীর বেকারদের ওপর।
ঞ) বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে, পশ্চিমবঙ্গে মূল নিয়োগের জায়গাগুলো হলো— প্রাইমারী, মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক স্কুলগুলোতে শিক্ষক নিয়োগ, আর আই-টি সেক্টরে নিয়োগ, আর ব্যক্তি-সংস্থা-উদ্যোগে কিছু লোক নিয়োগ। এতেও স্কুল-টিচার নিয়োগে অপমানকর যেসব দেনা-পাওনা জড়ানোর অভিযোগ উঠছে, তা লজ্জার, এবং কম বিত্তশালীর পক্ষে যোগ্যতা সত্ত্বেও বেকারত্ব ঘোচানো মুশকিল, আর যারা পাচ্ছেন, তারা স্রেফ একটা সময়কাল পর্যন্ত বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করছেন। গত তিন-চার বছরে এই দুটো-তিনটে ক্ষেত্রেও নিয়োগ প্রায় বন্ধ।
সব মিলিয়ে অবস্থাটা ‘জরিমানা দেওয়া মাইনের’ মতো। আর সর্বশেষ পরিস্থিতিতে যে কর্মহীনের সংখ্যা আরও অনেক অনেক বেড়ে যাবে তা অনেকটাই স্বতসিদ্ধ। পশ্চিমবঙ্গের কলুষিত রাজনীতিও অনেকাংশে তার প্রভাব ফেলে অর্থনীতিতে, ফলে একটা বঞ্চনার কথা উঠে আসে বারবার। ফেডারেল স্ট্রাকচারের দেশে, অনেকবারই অনেক জায়গায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উঠে এসেছে ‘বাঙালি খেদাও’ আন্দোলন-আলোড়ন। তার প্রভাবকেও ছোটো করে দেখলে চলবে না। সাংস্কৃতিক দিক থেকে এই কাণ্ডটা এই রাজ্য করেনি, ফলে নগরে-শহরে আবাঙালি সংস্থা ও কর্মযুক্ত মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। করোনা নিয়েই যদি আমাদের বাঁচতে হয় তবে আগামীদিনে কর্মসংস্থানের বিষয়ে কী দাঁড়াবে তা দুটো সরকার যেমন বলতে পারছে না, অর্থনীতিবিদরা বলতে পারছেন না, সাধারণ মানুষ তো নয়ই। সম্ভবত তাই ‘আত্মনির্ভরতা’র তত্ত্বটা বেশি করে সামনে আনা হচ্ছে। বেকারত্বের ক্রনিক-ডিজিজে ভোগা, পশ্চিমবঙ্গ সামনের দিনগুলোতে কোমায় না-চলে যায়!
৩
গেল শব্দ-খেল আর কারণানুসন্ধানে তথ্য-যুক্তি-তত্ত্ব-স্পেল। তারও পরে আরও কিছু থাকে। ওই ‘মাথার ভেতরে এক বোধ কাজ করে’। সংস্কারগতভাবেই হোক আর ধ্বনিগুণেই হোক এই ‘বেকার’ শব্দটি পড়লে বা শুনলে ভেতরে এক প্রতিক্রিয়া কাজ করতে থাকে। এই প্রতিক্রিয়া আসলে এই সম্পর্কিত বোধ-কে খাওয়ায়-দাওয়াও, পুষ্ট করে; জামা-কাপড় পরায়, সাজায়, দেখনদারি করে; লেখা-পড়া শেখায়, ঋদ্ধ করে; সাস্থ্যসম্মত করে গড়ে তোলে, যাতে প্রেজেন্টেবেল হয়। এই বোধকে প্রকাশ করা চাট্টিখানি কথা নয়। তবু সচেষ্ট হই কয়েকটি দিক তুলে ধরতে।
১) ‘বেকারত্বের যন্ত্রণা/ কষ্ট/ হতাশা/ জ্বালা’ ইত্যাদি শব্দগুলো সেই কোন অতীত থেকে আজ অবদি কান ঝালাপালা করেই চলেছে। সময়ের সরণে রূপ বদলেছে বারেবারে, কিন্তু বোধ-ব্যাপারটায় তেমন তারতম্য ঘটেনি। যেন নদীপথ চলেছে, তার ঝলাৎ-ঝল, খলখল, কলকল, কুলুকুলু শব্দে আর গতিতে। সাগর শুধুই সরে সরে যায়, যেতেই থাকে। কৈশোরোত্তীর্ণ যন্ত্রণায় দেখেছি বাড়ির কাছেই ‘মণীন্দ্র মিলস্’ আর ‘বিটি-মিলস্’-এর বন্ধ হয়ে যাওয়া। শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত আর অশিক্ষিত প্রায় ১৬০০ শ্রমজীবী মানুষের অন্ধকার ভরা, পেটে-লাথি-খাওয়া দিন-রাত। অর্ধাহার-অনাহার-আত্মহত্যা। সকর্মক মানুষের অকর্মক হয়ে যাওয়ায় ‘বেকার’ শব্দের সার্থক প্রতিফলন আমার মধ্যে। সময়কালটা ১৯৬৬-৬৭ হবে। আর প্রাক-যৌবনের বসন্তে পরিবারেরই বড়দাকে দেখেছি, চাকরির সন্ধানে উসকো-খুসকো, কম-কথা-বলা, মনখারাবি-ভাবিত। শিক্ষিত বেকার শব্দটার সঙ্গে খুব কাছ থেকে চেনা-পরিচয়। ‘কলকাতা-৭১’, ‘ইনটারভিউ’, ‘বাইসাইকেল-থিপ’, ‘সীমাবদ্ধ’, ‘মহানগর’ ইত্যাদি সিনেমা দেখা আমার বেকারত্ব কিছু ছিল না। পাঠক্রম শেষেই চাকরি, ও চাকরির সংস্থা বদল। ছিল না ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জে’ নাম নথীভূক্ত করার ঝামেলা, বা বেকার-ভাতা পাওয়ার জন্য ব্যাংকে খাতা খোলার হিড়িকে পড়া। তাই, যন্ত্রণা/ কষ্ট/ হতাশা/ জ্বালা এসবের সঙ্গে সহবাস হয়নি আমার। রোদে শুকোতে দেওয়া ভেজা চাদর, ঠান্ডায় রোদে দেওয়া লেপ-তোষক-বালিশ, আর বেকার-বন্ধু-বান্ধবের বাড়ি গেলে খাটটা দেখে ওই বিছানাটা যতটা আমার মনে হয়েছে ততটুকুই। বাইরের দেখা, আর ভেতরের অনুভব এক নয় জেনে-বুঝেও কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা ভুলে যাওয়ার নয়। সময়ানুসারে তারই কয়েকটি।
দৃশ্য ও কথোপকথন- ১ঃ- স্থান বহরমপুর সংলগ্ন কাশিমবাজার, সময়কাল – ১৯৭৭-৭৮, পাত্র-পাত্রী আমি ও আমার বন্ধুরা।
চাকরি করছি আমি, বন্ধুরাও কেউ কেউ, সাকার বলে যাকে। আবার অনেকেই হালে পানি পায়নি। কিন্তু সন্ধ্যার পরপর তাস-পেটানোর সূত্রে একত্রিত ও আড্ডা। খেলা শেষে হাসি-ঠাট্টা মশগুল। সিনেমা, খেলা, রাজনীতি, পাড়াতুতো খুনসুটি্র মধ্যেই একেক বার ‘বেকার’ পানকৌড়িটিও ভুস ভেসে উঠত। আমরা সাকাররা আলাদা করে কোনও ভয়ে থাকতাম না, বিলো-দ্যা-বেল্ট কোনও আঘাত খাব বলে। সন্ধান, প্রস্তুতি, লিখিত পরীক্ষা, ইনটারভিউ, ধরাধরি, লিয়াজো এসব নিয়ে মস্করার সঙ্গে সঙ্গে বিড়ি-সিগারেট বিনিময় এসবই চলত। কোথাও কি একটা তাল-কাটা ব্যাপার-স্যাপার ছিল? বহু চেষ্টা করেও আজ আর মনে করতে পারি না। দলে এক গোপাল ভাঁড়ও ছিল, দিলীপ আদিত্য নামে। ওর ইনটারভিউ দিতে যাওয়ার গল্পটা ছিল এইরকম- ডিস্ট্রিক স্কুলবোর্ড কিছু প্রাইমারি টিচার নিয়োগ করবে। ভ্যাকেন্সির একশ গুণ দরখাস্ত। ইনটারভিউ চলবে সাতদিন। দিলীপের দিনটা শনিবার। সময় দুপুর দুটো। মে-মাস, ঠাঠা রোদ্দুর। অভ্যেসের বাইরে গিয়ে সকাল সকাল স্নান খাওয়ার পর, ঠাম্মার কথায় চালাঘরটায় একটু গা-গড়িয়ে নিতে গিয়ে বেজায় ঘুম। মা এসে ডাকল যখন তখন সাড়ে চারটে। একটু আমের আচার খেতে খেতে মনে পড়ল ইনটারভিউয়ের কথাটা। লে হালুয়া! পড়িমড়ি সাড়ে তিন কিলোমিটার সাইকেল ঠেঙিয়ে সাড়ে পাঁচটায় যখন অফিসে, আরদালি আর বড়োবাবু ছাড়া কেউই নেই। দু-জনকেই স্যার, স্যার। দুজনের কাছেই স্বীকারোক্তি ‘ঘুমিয়ে পড়েছিলাম’। কাকুতি-মিনতি, ইনটারভিউটা কাল দেওয়ার ব্যবস্থা করা যায় না! নামানো চশমার ফ্রেমের ফাঁক দিয়ে বড়োবাবু শুধু এটুকু বলেছিলেন— ‘ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলে তো বাছা! ওই স্বপ্নেই তোমার ইনটারভিউ হয়ে গেছে। নাকচ হয়েছ। এবার এসো তো!” হতোদ্যম ফিরে আসা। এবারে দিলীপের নিজস্ব সংযোজন— “কী মরণঘুম রে আমার! কাল-নাগ এসে ইনটারভিউয়ে ছোবল মারল, আর একদম বুঝতেই পারলাম না! এখন বেহুলা হয়ে কলার ভেলায় ইনটারভিউ চাপিয়ে কতদিন যে জলে ভাসতে হবে কে জানে? কবে নেতানি ধোপার ঘাট পাবো জানি না।” কেউ একজন বলল, “আরে সগ্গে গিয়ে নাচতেও তো হবে!” দিলীপের তাৎক্ষণিক উত্তর, “অসুবিধা নেই দাড়িমোচ কামিয়ে, শাড়ি-সায়া-ব্লাউজ পরে, নেচে দেব। হ্যাঁ ব্রায়ের তলে দুটো নারকেলের মালই ঠেসে নিতে ভুলব না।” একটুও না-হেসে কথাগুলো তরতরিয়ে বলার পর এক ঝড় হাসি আর হট্টগোল। পেটে খিল ধরে শুয়ে পড়েছিল অনেকে।
ঘটনা ও কথোপকথন- ২ঃ- আমি তখন বাঁকুড়া শহরে থাকি, কাছাকাছি এক গ্রামে ব্যাংকের চাকরি, হেড ক্যাশিয়ার-কাম-ক্লার্ক, ইউনিয়ন করি, একটা পোস্টও হোল্ড করি। ব্যাংকে ভ্যাকেন্সি আছে, কিন্তু নিয়োগ নেই বললেই চলে। সময়কালটা ১৯৯৩-৯৪।
ইউনিয়নের তরফে রিজিওনাল অফিসে চাপ দিই, ডেপুটেশন-ডেমনেস্ট্রেশন-মেমোরেন্ডাম-ধর্ণা ইত্যাদি। তখন বিএসআরবি চালু, ক্লার্ক নিয়োগে ইউনিয়নের ভূমিকা, কেন্দ্রীয় অফিসকে দিয়ে ভ্যাকেন্সি ডিক্লেয়ার করিয়ে রিকিুজিশন পাঠানো। কিন্তু সাব-স্টাফ নিয়োগে ভূমিকাটা যথেষ্ট। কারণ ভ্যাকেন্সি স্যাংশন সেন্ট্রাল অফিস করলেও সংশ্লিষ্ট রিজিয়নের দায়িত্ব প্রক্রিয়া মেনে লোক নিয়োগের। রিজিয়নে (যার একটি অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি আমি) দরকষাকষির পর মোট ভ্যাকেন্সি ঠিক হলো ৬৫টা। প্রপোজাল জোনাল অফিসে গিয়ে কমে ৪৮ হয়ে ডিমান্ড গেল সেন্ট্রাল অফিস। ডিসিশনের অধিকারী সেন্ট্রাল অফিস স্যাংশান করে পাঠালো ৩৭-টা। অর্থাৎ নিয়োগ পদ্ধতি মেনে রিজিয়ন সাব-স্টাফ নিতে পারবে ৩৭ জন। ফোর্থ-ক্লাস স্ট্যান্ডার্ডের লিখিত পরীক্ষা হলো। তাতে ব্যাংকের ক্যাজুয়াল-লেবার (যারা ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় ডেইলি ওয়েজে নিযুক্ত সাব-স্টাফ। এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের সুপারিশকৃত নামের তালিকা অনুসারে প্রয়োজন ভিত্তিক নিয়োগ) সহ পরীক্ষার্থির সংখ্যা ৪০০০ ছাড়িয়ে গেল। তালিকা তৈরি হলো। দ্যাখা গেল, প্রথম ৩৭ জনের মধ্যে দু-তিনজন ক্যাজুয়াল-লেবার ছাড়া সব ফ্রেশ ক্যান্ডিডেট। অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে ব্যাংক-কতৃপক্ষের চুক্তি ক্রমে, রিক্রুটমেন্টের সময় ব্যাংকের ক্যাজুয়াল-লেবাররা প্রায়োরিটি পাবে। প্রায়োরিটি শব্দের অর্থ তারাই আগে চাকরি পাবে, ইরেসপেকটিভ অফ দেয়ার পজিশন ইন দ্যা লিস্ট, আলাদা তালিকায়। তারপরেও ভ্যাকেন্সি থাকলে সাধারণ তালিকা থেকে লোক নেওয়া হবে। নিয়োগ-পদ্ধতি চালু হলো, আমরা নজরদারি রাখলাম। এইচ-আর-ডি-র মাধ্যমে একদিন জানতে পারলাম রিজিয়নে নিয়োগে অনেকে এস-সি এস-টি ব্যাকলগ আছে। (এস-সি এস-টি র জন্য মোট ভ্যাকেন্সির একটা পার্সেন্টেজ নির্দিষ্ট, যা একটা রোস্টারে মেইনটেইনড হয়।) সেই রোস্টারের মাধ্যমে জানা গেল, আগের ব্যাকলগ এস-টি ১, এস-সি-৭। এবারের ভ্যাকেন্সি নিয়ে সংখ্যাটা গিয়ে দাঁড়ালো এস-টি-৩, এস-সি-১১। আমাদের সঙ্গে কথার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হলো পুরোনো ব্যাকলগ এবং এবারের সংখ্যা যুক্ত করে আগে এস-সি এস-টির রিক্রুটমেন্ট হবে, পরে সাধারণদের। কোনোভাবেই গাইডলাইনের বাইরে কাজ করা হবে না। স্বাভাবিকভাবেই ক্যাজুয়াল-লেবারদের তালিকা থেকে এস-সি, এস-টি-র জন্য আলাদা তালিকা হলো। এস-টি পাওয়া গেল একজন। দুটো ফাঁকা, যা ফ্রেশারদের তালিকা ভর্তি করা হলো। ক্যাজুয়াল লেবার এস-সি র তালিকায় ১৭ জনের নাম। নেওয়া হবে ১১ জন। নেওয়া হলো। বাকি ছ’জনের নানা চাপ সহ্য করতে হলো, যেন আমি বা আমরাই বাগড়া দিয়ে ওদের আটকে দিচ্ছি। চাকরি হতে দিচ্ছি না। চাপ খেয়ে শাখা-সম্পাদকরাও আমাদের পেছনে পড়ে গেল। অস্বস্তিকর এক পরিস্থিতি। শুরু হলো সাধারণ থেকে রিক্রুটমেন্ট বাকি ২৩ জনের জন্য। তালিকা বড়ো। ক্যাজুয়াল লেবারদের সবাই চাকরি পাবে না বোঝা গেল। এটাও একটা চাপ হিসেবেই নেমে এল। ধাপে ধাপে রিক্রুটমেন্টের কাজ চলল। একেক ধাপে ১০ জন করে। এরই মধ্যে আমার কাছে খবর আসতে লাগল, কেউ কেউ তাদের অরিজিনাল অ্যাকাডেমিক ক্যারিয়ার সাবপ্রেস করে ফোর্থ টু এইট স্ট্যান্ডার্ড স্কুল-লিভিং সার্টিফিকেট জোগাড় করে, তাই দেখিয়ে চাকরিতে ঢুকছে। জেনেও করার কিছু ছিল না, কী ম্যানেজমেন্টের, কী আসোসিয়েশনের। আমি সেক্রেটারি হিসেবে এইরকম অভিযুক্ত ৫-৬জনকে(এরা গ্র্যাজুয়েট বলে চিহ্নিত) একদিন ডেকে পাঠিয়ে মিট করলাম। জানতে চাইলাম প্রকৃত বিষয়টা। সবাই অস্বীকার করল। স্কুল-লিভিং সার্টিফিকেটটাই সঠিক জানালো। তখন আমি বলতে বাধ্য হলাম— “তোমরা তোমাদের সার্টিফিকেট ছিঁড়ে ছুঁড়ে ফেললে বা পুড়িয়ে দিলেও প্রকৃত তথ্য নষ্ট হবে না, যা রয়ে যাবে ইউনিভার্সিটির খাতায়। তাই কোনো কারণে তদন্ত হলে ‘সাবপ্রেশন অফ ট্রুথ’-এর দায়ে চাকরিতো যাবেই হতে পারে আরও অনেক কিছুই”। ওরা টলল না, ভয় পেল না, প্রায় সমস্বরে বলল- “বেকারের কী জ্বালা তা আপনি বুঝবেন না। যা হওয়ার হবে, বেকারইতো আছি, আবার নাহয় বেকার বনে যাব। এখন তো আগে চাকরিটা হোক। আর আপনারা তদন্ত করতে না-চাইলে তদন্ত হবে না। আগেও এমন হয়েছে, আমরা জানি। দয়া করে আমাদের পাশে থাকুন। বয়স ৩৫ ছুঁই-ছুঁই। এরপর আর চাকরি পাব না। জীবনটা বরবাদ হয়ে যাবে দাদা। প্লিজ আমাদের সহায় হোন”। মোদ্দা কথা বোঝা গেল, এরা সবাই গ্র্যাজুয়েট, চাকরি নিচ্ছে এইট স্ট্যান্ডার্ড কোয়ালিফিকেশনের। আর তার জন্য এত কাকুতি-মিনতি। জ্বালাটা বুঝিনি, কষ্টটা আন্দাজ করেছি। কোনোরকম চিঠিপত্রে না-গিয়ে চুপ মেরে রইলাম। দুই ধাপে ২০ জনের রিক্রুটমেন্ট হয়ে গেল।
ডিসেম্বর চলে এল। রইল বাকি ৩। খেলটা জমে গেল তখন। কলকাতা থেকে জেনারেল সেক্রেটারির মাধ্যমে জানতে পারলাম সেন্ট্রাল অফিস ‘ব্যান অন রিক্রুটমেন্ট’ অর্ডার পাঠিয়েছে ‘উইথ ইমিডিয়েট এফেক্ট’। সেই অর্ডার দু-একদিনের মধ্যেই পাঠানো হবে। ওঁরা আর রিক্রুটমেন্ট করতে পারছে না। আমি যদি কিছু করতে পারি, তবে যেন করি। চকিতে মাথায় বাজ। মাত্র ৩ জন বাকি। ওদের নামগুলো মনে আছে, কিন্তু চিনি না। ৩টে শাখার ৩-জন। দ্রুত কিছু করতে না-পারলে এই ৩-জনের চাকরি আর হবে না। সারারাত প্রায় ঘুম হলো না। তখন এই মোবাইল-যুগ ছিল না, যে যোগাযোগ শুরু করব। ২৭ ডিসেম্বর। ছুটলাম রিজিওনাল অফিস। রিজিওনাল ম্যানেজার ছুটিতে ৩১ তারিখ জয়েন করবেন। আর সেদিনই তাঁর রিটায়ারমেন্ট ডেট। প্রমাদ গুনলাম। সঙ্গিদের নিয়ে মিটিং-এ বসলাম। সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো কিছু। এ-আর-এম ও এইচ-আর-ডি ডিপার্টমেন্টকে বলা হলো ঘটনা। তাদের হেল্প চাওয়া হলো। রাজি হলেন তারা। আমরা ব্যবস্থা নিয়ে ক্যান্ডিডেটদের নিয়ে এলে তারা প্রসেসিং শুরু করে দেবেন, কিন্তু এপয়েন্টমেন্ট লেটারে সই করবেন কে? সে তো রিজিওনাল ম্যানেজার ছাড়া হবে না। আর তিনি কি চাকরির শেষ দিনে এপয়েন্টমেন্ট লেটারে আদৌ সই করবেন? যিনি চার্জে, সে পাওয়ার নেই। হাল ছাড়লাম না। তিনজনের নামে চিঠি হলো, ২৯ ডিসেম্বর তাদের রিপোর্টিং-মেডিক্যাল ইত্যাদি। সেই চিঠি নিয়ে ২৮ তারিখ সকালে ৩জন কমরেড বেরিয়ে পড়বে ওদের ঠিকানায়, বর্ধমান-বাঁকুড়া-মেদিনীপুরের গ্রামে, ওদের হাজির করবে ২৯ তারিখ। একজন কমরেডকে পাঠালাম সল্টলেকে আর-এম-এর কাছে, সব বলে তাকে রাজি করাতে, একটা বিশেষ সময়ে একবার আমার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলিয়ে দিতে। কথা হলো, সব শুনে তিনি ৩০ ডিসেম্বর জয়েন করতে রাজি হলেন। শুধু বললেন— ‘আমায় ফাঁসাচ্ছো না-তো! পেনশন, পি-এফ, গ্র্যাচুইটি, সব পাবো তো? আটকে যাবে না-তো?’ ইত্যাদি। আমি আশ্বস্ত করলাম। কারণ, কলকাতা চিঠি পাঠালেও তা টেবিলে পৌঁছুবে কাজ হয়ে যাওয়ার পরে। ২৯ তারিখ নিজের অফিস থেকে বাড়ি ফিরলাম। রিজিয়ন অফিসে ওদের মেডিক্যাল, রিপোর্টিং, বায়োডাটা চেকআপ, হয়ে নোটশিট রেডি। কাল হাতে হাতে এপয়েন্টমেন্ট লেটার। সন্ধ্যায় বাসার বাইরের দরজাটায় খটখট আওয়াজ। নিজেই খুললাম। দেখি দুজন ছেলে, ছেলে ঠিক নয় বয়স ত্রিশের বেশিতো হবেই। গেট পেরিয়েই একটা চাতাল মতো। সেখানে দাঁড়িয়েই তারা জানালো দুর্গাপুর রিজিওনাল অফিস থেকে আসছে, নাম অমুক-তমুক। আমি অবাক! “তা এখানে এলে, কীভাবে এলে, চিনলে কীভাবে? বাড়ী কোথায়?” খুব স্পিডে তারা উত্তরগুলো সব দিয়েই আমার পায়ে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল কাঁদো কাঁদো স্বরে। “আমাদের বাঁচান। যা হয়েছে, যতটা হয়েছে, আপনার জন্য হয়েছে। আমরা সব ভালো করে শুনে এসেছি। এখন শেষ রক্ষা যদি হয়, তাহলে আপনার জন্যই হবে। আর যদি না হয় ছেলেপুলে নিয়ে মারা পড়ব। (একজন বিবাহিত, এক ছেলে, এক মেয়ে) আর কোনোদিন আমাদের ভাগ্যে এই সুযোগ ঘটবে না।” ইত্যাদি। আমি তো কোনোমতে ছিটকে সরে বাঁচলাম। ওদের হাতে ধরে তুললাম, বললাম— “আমি নই। আমাদের অ্যাসোসিয়েশন যা করার করছে। আমি মাথা, তাই ব্রেণ টা আমার। এটুকুই। দ্যাখো, কাল কী হয়! আমি তো আশা করছি ভালোই হবে।” “না দাদা! যদি উনি না-আসেন, তাহলে আমাদের কী হবে? আপনাকে একটা ব্যবস্থা করতেই হবে। নয়তো আমরা ভেসে যাব”। দুজনেই কাঁদছে, চোখে জল। ঘরে নিয়ে এসে বসালাম। চা খাওয়ালাম, বোঝালাম— “উনি সদাশয় মানুষ। আমাকে যখন কথা দিয়েছেন আসবেন, এপয়েন্টমেন্ট লেটারে সই করবেন, তাহলে তিনি আসবেনই। চিন্তা কোরো না।” “তাহলে, কাল আপনি নিজে দুর্গাপুর চলুন, যদি কিছু হয়?” ওদের ভয়টা কাটছে না। “ওখানে আমাদের যে লোকজন আছে, তারাই পারবে। প্রয়োজনে আমি নিশ্চয়ই যাবো, আমাকে ৩১ ডিসেম্বর যেতেই হবে। ওইদিন স্যারের ফেয়ারওয়েল”। এবারে যেন ওরা কিছুটা আশ্বস্ত হয়েই ফিরে গেল। ৩০ তারিখ যথারীতি ৩জনের চাকরি হতে অসুবিধা হয়নি। এই টোটাল নিয়োগ-প্রক্রিয়াটা বেকারত্ব নিয়ে নানাদিকে আমার চোখ খুলে দিয়েছিল। প্রকৃত অবস্থান, ক্ষোভ-রাগ, অভিমান-আশা, হুমকি-নানা কথা শোনা, মিথ্যাচারণ, কাকুতি-মিনতি, কান্না-চোখে জল, অসহায়তা এমন নানা দিক। বাইরে থেকেও জ্বালা-কষ্ট-চাপ কিছুটা অনুভূত হয়েছিল বৈকি।
দৃশ্য ও কথোপকথন-৩ঃ- সময়কাল- ২০০৩-০৪। স্থান- বহরমপুর রবীন্দ্রসদনে ঢোকার মুখে লম্বাটে সিঁড়ি। কেউ বসে কেউ দাঁড়িয়ে। আমরা মধ্যবয়স্ক তিনজন। এস-এস-সি তে নতুন চাকরি পাওয়া দুজন, একজন কলেজের লেকচারার, আর নতুন চাকরি-পাওয়াদেরই এক বেকার বন্ধু।
সবাই কমবেশি লেখালিখির সঙ্গে যুক্ত। তো কথা চলছিল, সিনেমা পেরিয়ে রাজনীতি নিয়ে, হঠাৎই প্রায় এবাউট টার্ণ নিয়ে বেকার-বন্ধু প্রায় চিবিয়ে চিবিয়ে বলে চলল— “ল্যাওড়া! সব কথা তোমাদের মেনে নিতে হবে না? যা বলবে তাই ঠিক। আর আমি যা বলব, তাই বাল! আমি বেকার কিনা! আরে ওরা দুজন তবু লড়ে, মেধা দিয়ে চাকরি পেয়েছে; তোমরা তো ল্যাওড়া রুপোর চামচ মুখে দিয়ে জম্মেছ চাকরি পাওয়ার ব্যাপারে। কী লড়াইটা লড়েছ? এত টাফ সময় ছিল তোমাদের সময়? কম্পিটিশন ছিল? কামড়াকামড়ি ছিল? ডেকে ডেকে চাকরি দিত তখন! সেই চাকরি পেয়ে এখন সব বড়ো-বড়ো কথা চোদানো! সব জানি আমি।” টানা বলে ওর প্রায় সবটা ক্ষোভ উগড়ে দিল। আমরা তিনজন খানিকটা হতবাক, আক্রমণটা আমাদেরকেই, একদম বিলো দ্যা বেল্ট। আমরা দুজন দুটো বানিজ্যিক ব্যাংকে চাকরি করি, আরেকজন রাজ্যসরকারের সাব-এসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার। আমাদের মুখে কুলুপ। ওদের বন্ধুদের মধ্যেই একজন মুখ খুলল— “এই …দা! কী বলছ যা তা! আর বলছ কাদের! এটা ঠিক নয়।” দাঁড়িয়েছিল, বসল, পকেট থেকে বিড়ি বার করে ধরালো। একমুখ ধোঁয়া ছাড়ল। তারপর আবার- “ধ্যুস! কী ভুল বলেছি, ল্যাওড়া! তোরা তো তবু বেশ কিছুদিন বেকার বসেছিলি। আর এরা? পড়াশোনা শেষ, ব্যস্ ঢুকে পড়ল। কোনো কম্পিটিশন ছিল? এখন বড়ো বড়ো কথা বলা সহজ। এই সময় হলে অত সস্তা ছিল না! পাছার কাপড় নষ্ট হয়ে যেত বাছধনদের। কী বলো উমাদা, কথাটা কি আমি ভুল কিছু বলেছি?”। যা ব্বাবা, এবার যে ডাইরেক্ট আমাকেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়া, যেন আমরাই সব শূন্যপদ যোগ্যতা ছাড়াই আগলে বসে আছি, আর তার জন্যই মেধা থাকা সত্ত্বেও ওর চাকরিটা হচ্ছে না। আমরাই কারণ, ও তার ফল। অনেকক্ষণ সবাই চুপ। থাকতে না-পেরে মাউথপিসটা আমিই টেনে নিলাম— “দ্যাখ! তুই কী বলতে চাচ্ছিস বুঝতে পারছি না। তবে এটুকু বলতে পারি, আমরা কেউ রুপোর চামচ দূরের কথা, লোহার চামচ মুখে দিয়েও জন্মাইনি। অনেক সময় দুবেলা ভাতও জোটেনি ঠিক করে। আর ৬৪-৬৫র পর পশ্চিমবঙ্গে বিশেষত চাকরির বাজারটায় আকালই ছিল। আর যার সময় যে-রকম কম্পিটিশন, লড়াই। আমাদের সময়েও রেলে ১০০০ কর্মী নিয়োগে কয়েক লক্ষ এপ্লিকেশন জমা পড়ত। পি-এস-সি-তে আরও বেশি। আমরা দুজন যে ব্যাংকে ঢুকলাম তা লক্ষাধিক এপ্লিকেন্টের সঙ্গে সেম পরীক্ষায় বসেই। তখনও কম কিছু ছিল না। মেধা হয়তো আমাদের কম। কিন্তু যোগ্যতা না-থাকলে চাকরিটা পেলাম কী করে? ঘুষ দেওয়ার ব্যবস্থাও ছিল না, দেওয়ার ক্ষমতাও ছিল না। নিজস্ব সময়ে নিজের লড়াই। হ্যাঁ সময় এগোনোয়, শিক্ষিতের হার বাড়ায় কম্পিটিশনটা এখন আমাদের সময়ের থেকেও টাফ। তাতে প্রমাণ হয় না, তখন কড়ে আঙুল ধরে আমাদের চাকরি। আর কে বলতে পারে, আজকের দিনে হলেও আমাদের মুখে বুড়ো আঙুল চুষে ঘুরে বেড়াতে হতো? একটা জুটিয়েও তো নিতে পারতাম!” খুব মাইল্ডলি বললাম। পছন্দ হলো না ঠিক। বিড়িটা শেষ। উঠে দাঁড়ালো। বিড়বিড় করতে লাগল- “যত্তসব ডিপ্লোম্যাটিক কথাবার্তা! শালা, বোঝার ক্ষমতা আছে নাকি কিছু। রাজনৈতিক নেতাদের মতো কথা… সব জানা আছে… ” বলতে বলতে হাঁটা শুরু সঙ্গে বিড়বিড়। সবার শত ডাকেও ফিরল না সে। চলে গেলে কারণানুসন্ধানে নেমে পড়লাম আমরা। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখল সবাই। ওর বন্ধু বলল—“মাথাটা গেছে। ডিপ্রেশনে ভুগছে। কথার আগামাথা নেই”। অগ্রজ সাব-এসিস্টেন্ট ইঞ্জিনিয়ার বলল- “সে হতেই পারে। কিন্তু আমাদেরকেই টার্গেট করে এট্যাক করলো কেন এই ভাষায়, ব্যাপারটা ঠিক বোধগম্য হলো না”। আড্ডা ভেঙে গেল। গরম হয়ে ওঠা কান আবার ঠান্ডাও হয়ে গেল। এক অনুজ বেকার তার সব ক্ষোভ উগড়ে দিল, ধারণ যে করতেই হবে।
কথোপকথন-৪ঃ- সময়কাল ২০১৯। স্থান- কলকাতা। পাত্র দু-জন । ছোটো মামার ছোটো ভাগ্নে।
মামা— ভাগ্নে চাকরি তো একটা জুটে গেল। বেশিদিন বসে না-থেকেই যাক পেয়ে গেলি। তাও আবার বাড়িতে থেকেই। আই-টি সেক্টরের যা অবস্থা সব শুনি! খাওয়াস একদিন।
ভাগ্নে— হ্যাঁ মামা, শিওর হবে একদিন। পেলাম তো ঠিকই, কিন্তু মনমতো হলো কোথায়?
মামা— আরে হবে হবে। এক লাফেই কি স্বপ্নে পৌঁছে যাবি নাকি? মোট ক-ঘণ্টা থাকতে হয় অফিসে?
ভাগ্নে— তা সব মিলিয়ে ১০ ঘণ্টা। কোনোদিন আরেকটু বেশি। দেখি আরও খোঁজ করছি…
মামা— মানে যাতায়াত মিলিয়ে ১২ থেকে ১৩ ঘন্টা! তা মাসে কত করে দেয় রে স্যালারি?।।
ভাগ্নে— ওই, মানে, এখনতো সবে দু-মাস হলো! (হাসি) ছোটো কোম্পানি…
মামা— আরে কিছু একটা তো দ্যায়! তোদের তো আবার ইয়ারলি কনট্যাক্ট, তাই না?
ভাগ্নে— হ্যাঁ, মামা। দেখি, বাইরে গেলে প্যাকেজ বাড়বে।
মামা— সে খরচও তো বাড়বে। ঘরভাড়া, নতুন এস্টাব্লিশমেন্ট। কত আর বাড়বে!
ভাগ্নে— তা ঠিক। দ্যাখা যাক, আর কিছু পাই কিনা? মুশকিল টা হলো এরা একটা বন্ডে সই করিয়েছে, এক বছর চাকরি ছাড়া যাবে না। ছাড়লে স্যালারি ফেরৎ দিতে হবে…
অনেক কথার মধ্যে ভাগ্নে মামাকে স্যালারি-প্যাকেজের কথাটা বললই না। বেমালুম চেপে গেল। মামাও কম যায় না! বোনের সঙ্গে কথা বলে জেনে নিল, বছরে এক লাখ টাকার চুক্তি। মানে, দিনে ১২-১৩ ঘণ্টা দিয়ে একটা বি-ই, পাচ্ছে মাসে ৮৩৩৩ টাকা। মহানগরীতে এখনকার শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা অধিকাংশই কিছু না কিছু করে। কিন্তু কত টাকায় করে, আগের প্রজন্মের ঠ্যাকা না-থাকলে কী হতো, এসব নিয়ে ভাববার অবসরও পায় না।বন্ডেড লেবার খাটবে, তবু বেকার বলবে না নিজেকে। মফস্বল-গ্রাম বাংলায় বিষয়টা কিছুটা আলাদা।
নিজের কথায় ফিরে আসি। বেকার ছিলাম না। ছিলাম না কোনোকালেই? বেকারের বিপরীত সাকার ধরে বেকার ছিলাম না। এখনও না। পেনশন পাই। রীতিমতো প্রফেশনে লিখি— পেনশনার। কিন্তু নিজেকে বোকা-বোকা অর্থে, বাড়তি অর্থে, কিস্যু-না অর্থে, ফালতু বেগার অর্থে? সত্যিই বেকার বোগাস মনে হয়েছে কখনো নিজেকে। এক ধরনের যন্ত্রণা-কষ্ট-হিংসে-হিসেব নিজেকে জড়িয়ে ধরেছে। বহুর মধ্যে নিজেকে একা, তাচ্ছিল্যকর কেউ, গুরুত্বহীন এক, বিবেচিত হয়েছি বৈকি। সেটাই ‘ফালতু’ বনে যাওয়ার বেদনা। বেকারের ললিপপ। কয়েকটা তুলে ধরি—
ক) তখন কৈশোরের পাট প্রায় চুকিয়ে ফেলেছি। আমাদের বহরমপুর অঞ্চলে হোলি-তে রং খেলা দু-দিন। তো বেড়ে খেলা হতো রং। প্রথম দিন আবীর, দ্বিতীয় দিন রং। প্রথমদিন টা আড়মোড়া ভেঙে মাঠে নামার মতো। আবালবৃদ্ধবনিতার পায়ে কপালে আর শরীরে আবীর দেওয়া-নেওয়া। দ্বিতীয় দিনটা স্রেফ নিজেদের দল বেঁধে বন্ধুরা, পরস্পরে, দল ভার্সাস দল, আর পাড়ার সুন্দরীদের, আবার এটাও খেয়াল রাখতে হতো কারা মজা করে খেলে, কারা ব্যাজার মুখে, আর কারা মুখঝামটা মেরে রং নেয় মাত্র। খেয়াল রাখতে হতো বেপারার কেউ যেন সুন্দরীদের গা ছুঁতে না-পারে। তো, দ্বিতীয় দিনের খেলা চলছে। বেছে বেছে বার করা হচ্ছে সুন্দরীদের, তারা গতবার কে কী করেছিল মিলিয়ে মনে করা হচ্ছে। তো গতবার সান্যাল বাড়ির মন্টির পক্স ছিল বলে বেঁচে গেছে। এবার তো ছাড়া চলবে না। অতএব চড়াও। আমাদের চেয়ে মন্টি বয়সে ছোটো, কিন্তু একদম কচিটি নয়। হাঁকাহাঁকিতে ঘর ছেড়ে বেরোলো ছোটো বোনটাকে নিয়ে, যেন ঢাল। তবেরে… হারে-রে-রে ঝাঁপিয়ে পড়ল বন্ধুরা, তবে একে-একে বা বড়োজোর দুজন একসঙ্গে। ‘চলল রং/ সঙ্গে ঢং/ ইচ্ছে করে শরীর ছোঁওয়া/ তারও ফের বিশেষ আছে/ নইলে মজা অক্কা পাওয়া।’ আমি কেমন যেন বোকা-বোকা দাঁড়িয়েই রইলাম। কেমন বেগার। ওরা যখন রং-শরীরে মত্ত, আমি বোনটাকে রং দিলাম। শেষে যখন খেলা শেষ, চিনতে না-পারা মন্টি সামনে তখন রং দেবার আর জায়গা পেলাম না। দিলামও না। নিজেকে কেমন বোকা, বোকা.. মনে হলো। বেকার যত্তসব।
খ) এই তো বছর চোদ্দ-পনের আগে ‘কৃষ্ণনাথ কলেজ, বহরমপুর, প্রাক্তনী’-দের একটা বিতর্ক সভা। চলছে ফিজিক্স থিয়েটারে। বাঘা বাঘা সব বিতার্কিক আছেন সভার মতের পক্ষে আর বিপক্ষে। একসময়ের বিতার্কিক হিসেবে আমিও একজন পার্টিসিপেন্ট। সাকুল্যে জনা চোদ্দ। হল ছাপিয়ে শ্রোতা। নজরুল ইসলামও (আই-পি-এস অফিসার/ লেখক) একজন পার্টিসিপেন্ট। আমি ও নজরুল একই বছরে কলেজে ভর্তি হই। আমি ফিজিক্স, নজরুল কেমিস্ট্রি। পড়াশোনা ছাড়াও আমরা কলেজে ‘ডিবেট’, ‘এক্সটেম্পো’, ‘সেমিনার’ ইত্যাদিতে অংশগ্রহণ করতাম। কলেজ ছাড়িয়ে অন্য কলেজেও দুজনে গেছি বেশ কয়েকবার কলেজেরই প্রতিনিধি হয়ে। তো, তাতে বন্ধুত্ব গাঢ় ছিল নানান অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার কারণে। সেদিন নজরুল বসেছিল সামনের সারিতে, আমি গ্যালারির একটু উপর দিক বেছে নিয়ে বসেছিলাম। অনুষ্ঠানের কার্যাবলী শুরু হতে না-হতেই নজরুল গুটিসুটি উঠে চলে এল আমার কাছে। আমি বললাম- ‘করলি কি তুই? এখনি তোর ডাক পড়বে ওই সারিতে’। ‘ধ্যুস’ বলে উঠল ও। বললো— ‘আসুকগে। আমি এখানেই তোর পাশে বসব। এদ্দিন পর দেখা, একটু গল্প করব না?’ আমি দেখলাম, কেসটা কেলো হবে। কিন্তু মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। নিচুস্বরে কিছু কথা হলো। আর যেটা স্বাভাবিক, দেখা গেল, আমরা দু-জন পরস্পরের বিপক্ষ বক্তা। এটাই যেন নিয়ম হয়েছিল সেই কলেজ জীবন থেকে। এই নিয়ে একটু মস্করাও হলো। শুরু হলো বিতর্ক সভা, ভালোই জমল, শেষও হলো। আমরা নিজেদের টার্মে গিয়ে অংশগ্রহণ করে এলাম মঞ্চে। নজরুল যখন বলতে গেল, ওকে বলে দিয়েছিলাম— ‘মঞ্চে বলে, ওই প্রথম সারিতেই বসে যাস’। ব্যাটা আমার কথা না-শুনে আমার পাশেই চলে এল। আমি বুঝতে পারছি, বেশ কিছু মানুষের দৃষ্টি এদিকে আঁকুপাকু করছে। বিতর্কই ছিল শেষ অনুষ্ঠান। শেষ হতেই আমি বললাম—‘চল পালাই’। আর পালানো দিগ্গজেরা এদিকেই সব চলে এল। হাসি-ক্যালানো-কথাবার্তা-শুভেচ্ছা বিনিময়-আশীর্বাদ-সালাম-প্রফেশন-লেখালিখি সব ওর সঙ্গে ওকে প্রায় ঘিরে শুরু হলো। প্রথমে দু-একজনকে আমার সঙ্গে পরিচয় করাতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের সেদিকে তত খেয়াল ছিল না। আমি তো কেটে পড়তাম ‘সেলেব’-এর আওতা থেকে। কিন্তু ও আমার হাত চেপে ধরে রেখেছিল। ক্যালিয়ে ক্যালিয়ে দেখছিলাম আর শুনছিলাম সব। কান ভোঁ-ভোঁ করছিল। ভাবছিলাম ‘ধরণী ভাগ হও, আমি সালটে যাই’। হয়নি। প্রায় ১০ মিনিট চলল এই পর্ব। আমার কাছে অনন্তকাল মনে হয়েছিল। নিজেকে ফালতুস্য ফালতু, খাঁচায় পোড়া জৌলুসহীন শিম্পাঞ্জি, একটা ক্যালাস বেকার মনে হচ্ছিল। বেরিয়ে এসে ওকে কাঁচা খিস্তি দিয়ে বলেছিলাম—‘তোর পাশে আর বসব না’। নজরুল বলেছিল—‘তোকে ছাড়লে তো!’
গ) লাস্ট বাট নট দ্যা লিস্ট। বছর ৫-৬ আগে বাংলা অ্যাকাদেমি সভাঘরে কী একটা অনুষ্ঠান। কবিতা পড়ার ডাক ছিল আমার। প্রথমে ভেবেছিলাম, যাব না, যা ঘ্যামা ঘ্যামা সব কবির নাম তালিকায়! কিন্তু পরে ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও যেতে হয়েছিল। (এমন একজন অনুষ্ঠান করছিল আর আমাকে ডেকেছিল, যাকে এড়ানো মুশকিল ছিল।) কোনও নাম এই পর্বে নেওয়া যাবে না। অনুষ্ঠান শুরুর একটু পরেই গিয়েছিলাম (একদম রীতিবিরুদ্ধ কাজ আমার), যাতে শুরুর আগের গ্রুপ-গ্রুপ আলাপ-হাই-হুই-গম্ভীর-চিনেও না-চেনা ভাব-কোনো বিখ্যাতকে ঘিরে অনেক কথাঝুরির মধ্যে না-পড়তে হয়।(মনে রাখতে হবে সবার কথা বলা হচ্ছে না)। ভীষণ অস্বস্তি হয় বেশিরভাগ সময়। যাক এটাতে সাকসেসফুল। আর শেষের একটু আগে বেরিয়ে গেলে আমাকে আর পায় কে! কিন্তু বরাত খারাপ। চা-ইনটারভ্যাল ঘোষিত হলো, আর যারা কবিতা পড়বেন তাদের নাম, যার একজন আমি। যাচ্চলে। বেরোনো গেলো, চা-স্থলে, পরিচিত কম নয়, কিন্তু বুজুম নেই বললেই চলে, একাএকাই চা নিয়ে একটু দূরে, সেখানে এক-আধজন এল, কথা চলল, বাড়তে লাগল, চলছে কথা, চায়ে-চুমুক-সিগারেটে টান, যতটা মন্দ লাগবে ভেবেছিলাম লাগছে না। বেশ তো জমে গেছে। এই সময়েই উপর থেকে নেমে এলেন এক বিখ্যাত কবি। নেমে পৌঁছুতে পারেননি তখনও, দেখলাম আমার ভিড়টা পাতলা থেকে শূন্য হয়ে গেল। সবাই ‘ধায় যেন মোর সকল ভালোবাসা’ করে ছুট্টে ঘিরে ধরলেন ওঁকে। আমার পায়ে শেকল লাগানো ছিল না। যেতেই পারতাম, কিন্তু গেলাম না। এবারে একটা হাফ-সেলেবদের গ্রুপ (যারা বিখ্যাতদের ঘিরে ধরেননি) আমার ফাঁকাটার সামনে দিয়ে হেঁটে গেলেন সামনে। না হাসি বিনিময়টুকুও নয়। ঘামলাম! একটু বেশিই। গরম পড়েছে! না এসি থেকে বেরিয়ে এসেছি বলে! না অন্য কোনো কারণে নির্বাচন করতে পারলাম না। কিন্তু নিজেকে একা মনে হলো, ঘাড়বেঁকা মনে হলো, একজন বাড়তি মনে হলো। পাঠ শেষে, নির্লজ্জের মতো বেরিয়ে আসা, এক হাঁটা, একদম মেট্রোর প্ল্যাটফর্মে।
‘পিঠে রোদ’ নিয়ে বসি আমরা শীতের দিনে। যদিও জানি, বুকে-পেটে-মুখে নিলে তাপটা কিছু কম লাগবে না। তাপের পার্থক্য না-হলেও আমরা পিঠেই রোদ নিই কতকগুলি বৈজ্ঞানিক ও ব্যবহারিক সুবিধের কারণে। তা, এই একইরকম সুযোগ-সুবিধাকে ধ্রুবক ধরে, বৈজ্ঞানিক ও ব্যবহারিক দিকগুলো খতিয়ে দেখে কর্মসংস্থানের বিষয়টি কখনই মনে-প্রাণে ভাবেনি বা রূপরেখা তৈরি করেনি আমাদের রাষ্ট্র ভারত, দেখা হয়েছে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে। আরেকটা আপ্তবাক্য আছে— ‘রোদের সময় ভেজা-বিচালি শুকিয়ে রাখতে হয়।’ তো, ভারতে কখনও সেভাবে রোদ উঠেছিল কি যাতে চোপসানো বেকারিকে শুকিয়ে নেওয়া যায়? জন্মক্ষণের পর থেকেই, সীমান্ত-যুদ্ধ, যুদ্ধের বাতাবরণ, হুংকার-প্রতিহুংকার চলেছে, আজও যা জারি। আর অভ্যন্তরে একাদিক্রমে প্রাদেশিকতা, সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ, জাতপাতের লড়াই, উগ্রতা-হিংস্রতার মধ্যে চলতে হয়েছে যেখানে সঙ্গি হিসেবে বহুদলীয় সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা, তার সাময়িক রাজনৈতিক লাভালাভের কারণটি কখোনই ভুলতে পারেনি, বা অস্বীকার করে অগ্রসরমানতার বার্তা দিতে পারেনি। ফলশ্রুতিতে আজকের অসুখের দিন অভাবের দিন বেকারের অ-দিন। আর ব্যক্তিক বেকারত্ব ছিল, আছে, থাকবেও। সে ধরা-অধরার মাঝে একফালি বিশ্বস্ত দুঃখবাদের প্রতীক।
“এবং চিলেকোঠা” বেকার সংখ্যা এর জন্য দুটি লেখা
ঠুঁটো জগন্নাথ
কৌস্তভ কুন্ডু
হাতটা সোজা পেটের ভেতর চালান করে দেখলাম গতকালের পচা খাবার, আজকের গু, কিছুটা তরল ও প্রবৃত্তজনিত গুটিকয়েক শূন্য কঠোর। আর অনেকটা খিদে। চাহিদা ও যোগানের একটা বিস্তৃত ফাঁকা রাস্তা। হাতের তালুতে পেন্সিল দিয়ে চাহিদাটুকু লিখে পেটের ভিতর থেকে হাতখানা বার করে চালান দিলাম বুকে। বুকের শূন্যতা বোঝা মুশকিল। বেশিরভাগটাই ল্যালপ্যালে অন্ধকার, বেশ পুরু একটা চারকোলের স্তর, কয়েকটা জোনাকি এধার-ওধার ঘোরাঘুরি করছে। তাছাড়া মাঝে মধ্যে ধুকপুকানির ওঠানামাটা দেখে আমার সদ্য এস. আই. পি-তে রাখা টাকাটার কথা মনে পড়তেই হাতটা ছিটকে বেরিয়ে এলো যেভাবে হঠাৎ বিশ্বাসভঙ্গের পর প্রেমিক ছিটকে এসে নেশাসক্ত হয় মধ্যরাতে। আর গালাগালি দেয় একদা সুন্দর দেখতে চাঁদের গোলকটিকে।
যাইহোক, এখন মধ্যরাত। সুতরাং হাতটি নিম্নগামী হলো। নিম্নাঙ্গের ঢালু বেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো জন্মযন্ত্রের ওপর। তার ভেতরকার ছুটন্ত শুক্রাণু ভীড়ের ভেতর। এলোমেলো পিঁপড়েদের মতো শুক্রাণুরা কিছু একটা বিপদের সঙ্কেত পেয়ে আগোছালো হুড়োহুড়ি শুরু করে দিলো। নিতান্ত শ্রমিক হয়ে থাকার ইচ্ছাটি নিয়ে দৌড়তে লাগলো এদিক-ওদিক। একটু হাত ঘোরাতেই শেকড়ের মতো দেখতে কিছু প্রজাপতির স্পর্শ পাওয়া গেলো। যদিও এযাবৎ হাতটির উদ্দেশ্য ছিলো ধর্ষণের মূল অভিযুক্তকে প্রমাণ সহকারে পাকড়াও করা, যদিও উদ্দেশ্যের টিকিটি হতাশ হয়ে বিধেয় খেলনাপাতির ভেতর হাঁপিয়ে উঠে শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে এলো একটি ধূসর বেড়াল হয়ে...
হাতটি যেহেতু বেড়াল হয়ে গেছে সুতরাং সে একমাত্র গৃহস্থের বাড়ি থেকে মাছ ইত্যাদি জাতীয় খাবার চুরি করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিল। আর একটু খোঁচা দেওয়ার পর রেগে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে জানালো -মানুষের হাত একটি নিস্ত্রিয় বোমামাত্র। আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। আপাতত সে বেকার। রাষ্টযন্ত্রের কেনা গোলাম। ঠুঁটো জগন্নাথ।
---------
সাদা পৃষ্টার ভেতর
প্লেট
খালি হয়ে যাওয়ার পর চামচ যেভাবে কেঁদে ওঠে শব্দ করে
সেরকম একটি টুপ শব্দ
– অনন্ত নিরালায়।
এরপর চেনা গলির মতো রাত নামে শরীরের ফুটপাতে। যদিও শরীর তো বেকার। ... ... ... ... ... ...কথাটিও।
অতএব গৃহস্থালির ভেতর সাপেদের অম্বল যাতে বেড়ে না যায় সেইহেতু, যেভাবেই হোক কিছুটা বমি করতে হয় সাদা পৃষ্ঠার ভেতর। এরকম কিছু বমি মানুষ র্যাকে সাজিয়ে রাখে পয়সা দিয়ে কিনে। প্রবল চিৎকারের পর, দীর্ঘ বিপ্লবের পর, অসংখ্য মৃত্যুর পর, র্নিঝঞ্ঝাট প্রেমের পর যেটুকু মাটি জেগে থাকে পৃথিবীতে সেইটুকুই একজন বেকারের নিশ্চিন্ত জন্মানোর, বেড়ে ওঠারও। তবে কথাটা এখানেই শেষ হয়ে যায় না, একটি চিতা থেকে আরেকটি চিতায় আগুন লাগানোর মধ্যবর্তী সময়টুকুতে নির্বাচিত কিছু আয়নার দৃশ্য ভেঙে ফেলতে হয়। তখন অজস্র টুকরো আয়নার, কয়েকটা, খুব ধারালো আর তীক্ষ্ণ হয়, এতটাই যে খুন অবধি করা যায়।
খুন ও পরবর্তী খুনের মধ্যবর্তী রচিত হয় জীবন দর্শন। যদিও বারবার এভাবে বেকার বলাটা শ্রুতিকটু লাগে। তবুও এটি, জলের আগুন হয়ে ওঠার মূল মন্ত্র—বাণী বিশেষ।
যাইহোক যুদ্ধ ঘোষণার পর একজন পটু বেকার যা দেখতে পায় তা একটি ঋতুকালীন দীর্ঘ ফসলের মাঠ, এদিক-ওদিক ফেলে দেওয়া রক্ত কাপড় ও হ্যাইজেনিক প্যাড অথবা অজস্র বন্য পাথর – শিব লিঙ্গ বিশেষ।
অথবা
বিন্দুটি শেষ হয় না কিছুতেই, আবর্তিত হতে হতে শক্ত নিটোল একটা রাণী গুটি হয়ে ক্যারামের চারটি পকেটে ঘোরাফেরা করে।
তারপর
রূপান্তরিত গলায় ডেকে ওঠে একটি বিতাড়িত কাক। কলসীর কথা ভুলে যায়...............
গল্পটাও।
বেকারত্ব বলতে আমি যেটা বুঝি
অনুপম মুখোপাধ্যায়
এক-এক টুকরো বেকারত্বকে আমি জীবনে অনেকবার নাড়িয়ে দেখেছি, তার চারদিক থেকে আলো ঝলমলিয়ে ওঠে। যতক্ষণ পর্যন্ত তার মধ্যে আছে অবসরের রোদ, কিন্তু অকর্মণ্যতার অন্ধকার নেই। রোদ আর অন্ধকারের খেলায় এই পৃথিবী। জীবন কেবলমাত্র কাজের ভারে তো চলছে না। চলছে অকাজের ঠেলায়। অকাজ তাকে অনবরত ধাক্কা মেরে মেরে এগিয়ে নিয়ে চলেছে আনন্দের দিকে, বিস্ময়ের দিকে, পরিপূর্ণতার দিকে। একজন কাজের মানুষের কিছু না করে বসে থাকার নাম বেকারত্ব নয়। কিছু না করে বসে থাকা কাজকে কল্পনা করা। কর্মপরিকল্পনা। বাস্তবিক কাজের চেয়ে কাল্পনিক কাজের দাম কম নয়, বহুগুণ বেশি। যা একবার কল্পিত হল, সে কিন্তু পুরোপুরি হয়ে রইল। তাকে যেমন পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত করা যাবে না, আবার মিথ্যা করাও যাবে না।
যে কাজ হচ্ছে, হয়ে চলেছে, তার চেয়ে যে কাজটা হবে, যেটা ভবিষ্যতের কাজ, সেখানেই যেন প্রাণের টান বেশি মনে হয়। অফুরন্ত রোদের মধ্যে চেয়ার পাতা আছে, সেই চেয়ার গুটিয়ে নেওয়া হোক, বা তাতে কেউ বসুক, চেয়ারের কাজে লাগা বাকি আছে, তাই সে চেয়ার। ওই চেয়ার যদি কাঠের হয়, তাহলে গাছের মধ্যে তার কল্পনা ছিল, এবং সেজন্য তাকে পৃথিবীর প্রথম চেয়ার হতে হয় না। হয়ত যে কোনো চেয়ারই পৃথিবীর প্রথম চেয়ার। এবং, সে একান্তই এক বেকার চেয়ার। তার উপরে উঠে আপনি রান্নাঘরের কালিঝুলমাখা কেটে যাওয়া বাল্ব পাড়তে পারবেন না।
সভ্যতার ইতিহাসটাও ফাঁকা চেয়ারে রোদ আর বৃষ্টি পড়ার ইতিহাস। বেকারত্বই সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যায়, বিস্তৃত করে, বাঁক ধরায়, অন্য বা একই পথে তাকে বাঁচিয়ে রাখে। সেই বেকারত্ব কর্মহীনতার নয়, বরং অভিনব ও অভূতপূর্ব কর্মপরিকল্পনার। গ্রাসাচ্ছাদন আর পরিবার পরিকল্পনার বাইরে মানুষের যে রোদ আর বৃষ্টিমাখা অবসর, সেখানে যে তার ব্যক্তি স্বাধীনতা, ব্যক্তিত্বের মুক্তি, মননের উন্মোচন, সেখান থেকেই সভ্যতা। কর্মব্যস্ত লোক সমাজ আর সংস্কৃতিতে খুব বড় বড় ভূমিকা হয়ত নিতে পারে, সভ্যতার সঙ্গে তাদের লেনদেন থাকে না। সভ্যতা এগোতে থাকে কাজের ফাঁকে ফাঁকে, কাজের মধ্য দিয়ে নয়। একজন মানুষের যদি পেটের টান না থাকে, মাথার উপর ছাদ থাকে, সে তখন কবিতার দিকে যায়। আমরা যতই শিল্পীর দারিদ্রকে মহীয়ান করি, আমরা আসলে তাঁর বেকারত্বকেই উদযাপন করি, কিন্তু সেই বেকারত্বের পরিসরে যতক্ষণ ক্ষুধা আর আশ্রয়হীনতা লেগে আছে, ততক্ষণ তাঁর পক্ষে সৃষ্টি সম্ভব নয়।
যেমন ধরুন ভিনসেন্ট ভ্যান ঘগকে তো মোটের উপরে একজন পাগল বেকার লোক হিসাবেই ধরা যায়। তাঁকে খাইয়ে পরিয়ে রাখতেন তাঁর ভাই থিও ভ্যান ঘগ। ভিনসেন্টকে সবাই যখন বেকার ভাবত, ভিনসেন্ট তখনই তাঁর সভ্যতা রচনার কাজে মত্ত থাকতেন। এই যে মত্ততা শব্দটা বললাম, সৃষ্টিসুখের উল্লাসের কথা বললাম, এ একান্তই বেকারত্বের দান। কিন্তু তা কর্মহীনতা নয়, কর্মবিমুখতা নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে এ ক্ষেত্রে আমাদের গুরু ধরা যায়। সকল কাজের ফাঁকে তিনি নিজের জন্য যে বিপুল অবসর রচনা করেছিলেন, জমিদারি দেখাশোনা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা ইত্যাদি সবকিছুর ফাঁকে ফাঁকেই তিনি নিজেকে যে বেকার করে তুলতে পেরেছিলেন, তারই বিপুল প্রাচুর্যকে আমরা আজ তাঁর রচনাবলী হিসাবে ভোগ করি। এই একই কথা হয়ত আমরা মাইকেলেঞ্জেলো, দা ভিঞ্চি, পিকাসো, মোজার্ট, বিথোভেন, মিলটন, গ্যেটে সবার ক্ষেত্রেই বলতে পারি। এঁরা সবাই একেকজন বেকার লোক, কারণ এঁদের কাজের তুলনায় কর্মপরিকল্পনা বিপুল, সেই তুলনায় এঁদের সমসাময়িক কেরানি আর ইস্কুল মাস্টাররা অনেক বেশি কাজের লোক ছিলেন।
সমাজে একজন কবির চেয়ে একজন দাঁতের ডাক্তারের মূল্য চিরকাল বেশি ছিল, চিরকালই বেশি থাকবে। আপনার যখন দাঁত কনকন করছে, আপনার পক্ষে ‘মুক্তধারা’ পাঠ করা সম্ভব নয়, আপনি তখন পিকাসর ব্লু পিরিয়ড নিয়ে কিছু শুনতেই চাইবেন না, কারণ তাতে আপনার কনকনানি কিছুমাত্র কমবে না। যারা কাজের লোক, তাদের বেকারত্বে সমাজের কোনো মাথাব্যথাই থাকে না। একটা সময় আসে কাজের লোকগুলো নিজেদের ডাক্তার-উকিল-মাস্টারের বাইরে আর কিছু ভাবতেই পারে না। তারা যে একসময় একটা ঘাসজমি ছিল, তা অন্যদের সঙ্গে নিজেরাও ভুলে যায়, ঘাসজমিটার উপরে একটা কংক্রিটের পাটাতন পড়ে যায়, সেটার তলায় কী আছে সেটা আবিষ্কার করা তখন অনেক মিস্ত্রিমজুরের কাজ, এবং তাতে অনেক অনুমতি আর অনুমোদনের ব্যাপারও এসে পড়ে।
বেকারত্বের আরেক নাম তো এই নয় যে, সরকার আপনার ভাত-কাপড়ের সংস্থান করতে পারছে না, ধর্মতলায় একটাও কর্ম খালি নেই, আর চায়ের দোকানে মুখ্যমন্ত্রীকে অভিশাপ দেওয়া হচ্ছে কেন এ বছর স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষাটা হল না, বা প্যানেলে এত অস্পষ্টতা কেন! সেটা বেকারত্ব নয়। অন্তত যে বেকারত্বের কথা আমি বলছি, সেটা তা নয়। আমি বেকারত্ব বলতে বুঝি একজন স্কুল সার্ভিস কমিশন বা পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা দিয়ে চাকরি পেলেন, কিন্তু তারপর তিনি কেবল আহার-নিদ্রা-মৈথুনের চাকার মধ্যে নিজেকে বেঁধে না ফেলে বরং এই প্রথম জীবনে অবকাশ পেলেন, যেখান তিনি জীবনের অপ্রয়োজনকে নিয়ে আনন্দ করতে পারবেন। তখন তাঁর সুযোগ এল সারা পৃথিবীর সাহিত্য-শিল্প-সঙ্গীত-নাটক উপভোগ করার, অনেক দূর দূর দেশে বেড়াতে যাওয়ার। যে চাকরি খুঁজছে, তার যে শ্রম আর নিষ্ঠা, তাকে বেকার কী করে বলা যায়? চাকরি খোঁজার কাজটা তখন তার সর্বস্ব জুড়ে আছে। জীবিকাহীন লোককে বেকার বলাটা সামাজিক কুসংস্কার ছাড়া কিছুই নয়।
অর্থাৎ দিনগুজরানের কাজটা নিশ্চিত ও স্থায়ীভাবে হাতে পাওয়ার পরেই একজন মানুষ জীবনে নিজেকে অনেকাংশে বেকার করার সুযোগটা পান, কারণ চাকরি যতই সময় নিক, তারপরেও জীবনে প্রচুর অবকাশ থাকে, তাঁকে ফুরসৎ দেয় নিজের জীবনটাকে নিজেরই জীবন বলে বুঝে নেওয়ার। কিন্তু বাঙালি যেটা করে, সে তখন নিজের অবসরকে রান্নাঘরের ঝুলকালিমাখা বাল্ব পাড়ার চেয়ার বানিয়ে নেয়। কোনো রোদ আর বৃষ্টি তাকে স্পর্শ করে না। বেকারত্ব তখন এল দোরাদো।
রাহুল গাঙ্গুলী
।। রোবোটিক্যাল অভ্যন্তরে সপ্তর্ষিভালুক ।।
একটি মন-গড়া ভূমিকা
পৃথিবী তৎকালীন সময়ে একটা ধারণা মাত্র হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তৎকালীন মানুষ , অধুনা জিএল ওয়ান সি একুশ শতকের সাথে সাথে প্রস্তুতি নিচ্ছিল একটা প্রসেসড হোমোজেনিয়াস বাসস্থানের , পৃথিবীর সব ভালো ভালো উপাদান সেইখানে স্থানান্তরিত করে দেওয়া হবে । তবে এই বিষয়টা এতটাও সহজ ছিল না। পৃথিবী জুড়ে একটা কমিটি গড়ে শুরু হল সবাইকে বোঝানো, কীভাবে বাঁচতে হবে ? সেইসময়কার সব দেশে দেশে সেই কমিটি গেল । মানুষের লম্বা লাইন পড়ল। তারাই ঠিক করল কারা নিও-অ্যাকোমোডেট এইচ সি থাকার যোগ্য। কারা নয়। বাছাই শুরু হতে হতে প্রায় দেড় দশক পেরল। দেশ কনসেপ্ট ভাঙছে, জাত – গায়ের রঙ, ধর্ম , কাউকে অকারণে দোষারোপ করা যাবে না হত্যা করে পুড়িয়ে খাওয়া যাবে না। দেশের রাজারা লেলিয়ে দিল উস্কানি দিল লোকজনদের। সে এক ভয়ানক বিপ্লব বিপ্লব লড়াই। অপারেশন বেরিয়ার আর নিও-দের অপারেশন ফ্রন্টায়ার। লড়াই লড়াই লড়াই হল কিন্তু সেটুকু স্রেফ রাষ্ট্রনেতারাই বুঝলো। জনগণ নিজেদের মধ্যে গটা-প করেছিল মিছিমিছি লড়ল। তবে জনগণের ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খেল অর্থাৎ সব ভালো উপাদানের পেটেন্ট নিয়ে রাখল রাষ্ট্র–নায়ক নায়িকা ও প্রোডিউসাররা। জনগণ আর রাষ্ট্র-নায়কেরা বুঝলেন তারা একে অপরকে বোকা বানানো ছাড়া এতদিন কিছুই করতে পারেননি। অতএব
জনগণ চায়লো তার নিজের মতো শাসক, অপেক্ষাকৃত কম চতুর, ইএক্স ১
রাষ্ট্র নায়কেরা চায়লো তার নিজের মতো প্রজা, অপেক্ষাকৃত কম বুদ্ধিমান, ইওয়াই ১
ইএক্স ১ এবং ই ওয়াই ১ নিজেদের মতো করে চায়লো, সফটওয়ার এডি১ভি
দুম করে তৈরি হয়ে গেলো, নিও-অ্যাকোমোডেট এইচ সি। ই ওয়াই ১ এবং ইএক্স ১ এর কাজগুলো সিঙ্ক করতে গিয়েই মানুষ বুঝেছিল একটা উনিভারশাল ল্যাঙ্গুয়েজ মোড জরুরি। সব কিছুর উর্দ্ধে অনুভবটাই বিশুদ্ধ হওয়া দরকার। ভাষার কবিতার চেয়ে অনেকবেশি দামি কবিতার ভাষা, সেইটাতেই এখন কবিতা এগিয়ে চলেছে। ভাষাপ্রধান কবিতা স্থানান্তরের মুহূর্তে বহুলাংশে শক্তিক্ষয় করে ফেলত। ভাষার অন্যতম টুল শব্দ দিয়েই তৎকালীন পাঠককুল মাপত কবিদের ‘মাহাত্ম্য’ ! বর্তমানে টু আলফা থার্টিসেভেন সালে এসে দাঁড়িয়ে যা সত্যিই হাস্যকর।
টু আলফা থার্টিসেভেন সালের কয়েকটি কবিতা রইল –
রোবোটিক্যাল অভ্যন্তরে সপ্তর্ষিভালুক
------------------------------------------------------------------
০ → ০
⇘
০
⇘
০ ⇝ ০
⇗ ⇙
০ ⇠ ০ _____ ০ ⇭
⇲ ⇱
||
↺ ⇹
➲ ০ ⇶ % ¢
↻ ┹
✃ ✂
কোণাকোণি পাতাল থেকে স্বেচ্ছাচারী
----------------------------------------------------------------
নিষ্ক্রিয় বিছানার সূত্র নিলেই
গুটিকতক অবসর-মিথোস্ক্রিয়া এবং
পারমাণবিক বাগান গল্পবাজ
এখনো ______
চলছে ~ বেকারত্ব ঘিলু || থকথক্ টুপ
স্মৃতিবাজি বছর
টলতেটলতে ঘুরেফিরে
প্রতিটা রাত
চাঁদের লালা
বেহেড মাতাল আংশিক
ঘুমলোভী রুদ্রাক্ষগাছের বীজ ______
হাওয়া-ফিনিশ অযথা
নৈশব্দ কন্ঠনালী ~ 'হাতিম'-মার্কা লন্ঠনের ক্ষুর
আস্তেআস্তে
রুদ্রাক্ষ হয়ে ওঠে ~ ভুলচুকের তুমুল মসৃণ
উড়ন্ত বেলুনের নিরাকার গল্প
---------------------------------------------------------------
০ X ০ = ০
০ X ১ = ০
০ X ২ = ০
০ X ৩ = ০
" " " " " " " " " " " " " " " " " " " " " " " " " " " " " "
→ ∞ ← || → ∞ ← || → ∞ ← || → ∞ ←
" " " " " " " " " " " " " " " " " " " " " " " " " " " " " "
৩ X ০ = ০
২ X ০ = ০
১ X ০ = ০
০ X ০ = ০
পয়গম্বর বলছেন ~ সবই চুম্বকজাতীয় মায়া
১টা কালো সাদাকে খেয়ে ফেলছে
অথবা বিপরীত _______
++++++++++++++++++
১টি ভাবী ইলেকট্রন & লিনিয়ারিক্ মৃত্যু
---------------------------------------------------------------------
আজও ______
// ১টা লিলিথপূজো আঙুল \\
০ ০ ০ ০
➚ ➘ ➚ ➘ ➚ ➘ ➚ ➘
০ ০ ০ ০ ০
মুহূর্ত ]]] ৩য় আত্মক
ঘটে যায় ইশারা (মেঘ.)
০ ০ ০ ০ ০
➘ ➚ ➘ ➚ ➘ ➚ ➘ ➚ ➘
০ ০ ০ ০ ০
|আ⁺
য্যানো | বে⁺
ঘষটাচ্ছে সূর্য || কিছু || | শি⁺
সূর্য | ত⁺
ঘ | জ⁺
ষ | ল⁺
টা | গু⁺
চ্ছে | ল্ম⁺
+++++++++++
হারাকিরি ও গোলাপের গপ্পো
----------------------------------
ঘুম } ১টি বিষম দূরত্ব বিশেষ
স্বপ্ন তৈরি হয়।ভাঙে
জাগে।উদ্বৃত্ত ঘুম
আদপে _____
এই সব বেকার হল্লাবোল
আদিম পুং-চক্র-কেশর-স্ব|পুংশকতা
অনৈতিক পেটে ~ ঘূর্ণি-বিয়োগ
আগামী আদমসুমারি
অবশেষে শিবলিঙ্গের খাদ্য-খরা কাটিয়ে
ভার্চুয়াল ফুটপাথে ঘটছে ~ কৃষিকাজ সমীকরণ
# # # # # # #
শব্দরুপ - রাহুল গাঙ্গুলী
ভূমিকা – চয়ন দাশ
লেট দেয়ার বি ক্যাওস
প্রতীক ঘোষ
চামড়ার নীচে অসহ জ্বালা
আমার খাল জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে গডফাদার...
এখন জল থেকে ফেনা উঠে আসে
নার্সিসাস-আয়নার সামনে হায়নার মুখ থেকে ঝরে পড়ে লালা-রক্ত
মৃগ-মাংসয় মুখ ডুবিয়ে আসা হায়নাদের চোখের রং আমি দেখেছি গড ফাদার
জ্বল-জ্বলে হলুদ...
আগুনের শিখায় ঝাঁঝালো মদ ঝরে পড়ে
তবু হে গড... হে ফাদার...
জলের উপর পুরুষাঙ্গের মতো নেভানো চিমনির ছায়া ফেলে ফেলে
আমার বেহুদা দিন
আমার বেহুদা রাত
কেটে যাচ্ছে
লেট দেয়ার বি ক্যাওস...
অন্ধ বাউলের একতারা
সন্তোষ চক্রবর্তী
১.
অন্ধ বাউল যে সুরে মোহিত, তার অতলে নিক্ষেপিত তুমি।
বোকা এক শালিক ওই সুরের কাছে আশ্রয় নিয়েছিলে কতকাল!
ওর খর করতলের নিচে মেঘ, তার নিচে আয়ুরেখা!
সাধনা শেষ, তাই উচ্ছিষ্টটুকু পঞ্চভূতের উদ্দেশ্যে রেখে অধমের অতলে গমন। আপন জনক-জননীর পদতল আশ্রয় চিরকাল।
নিমফুলের গন্ধ, আশ্রমবাড়ি, তালসারি, গ্রামীণ মায়া, বুনোপাখি, ছদ্মবেশী বৌষ্ঠম এদের জন্য রেখে যায় কিছু। সারিবদ্ধ সংকল্প
কোনোদিন এর পূর্ণ সংকেত পেলে অভয় পাবে !
আর কোন উপাচার নয় এমন কাঙালের নিমিত্তে।
আসা যাওয়ার পথে যা কিছু রেখেছি, সামান্যই দৈব ভাব !
আত্মা বিয়োগের দরুন নতুন ঋতু এসেছে অন্ধ বাউলের সহজ কৌশলে। তাকে নিশিদিন সংকোচে কৃতজ্ঞতা জানাই।
২.
সুখের দিনে মানুষ একা হয়ে যায়। দুঃখের দিনে অন্ধ বাউল ঢুলু ঢুলু মফস্বলে হাতে তোলে একতারা। ধুলোর শরীরে অবসন্নতা পায় না আর। সুতরাং সে হন্যে হয়ে খুঁজে ফেরে সেইসব অবসাদ মুখর দিন। আসলে যা হারায় তা তো চোখের আড়াল হয়ে। বৃষ্টিপাতের শব্দে মশগুল হয়ে গুনগুন করে হাতরে বেড়ায় সেই সুর, যা হারিয়ে গেছে। অথবা নিশ্চিত আমার আগেই হারিয়েছে কেও। আর সুখের দিনে পরাজয় হলো সেই একমুখী ডাক, যা তোমাকে শান্তি দিয়েছে।
তোমাকে শান্তি দিয়েছে বোকা এক শালিক। শনি দেবতার বাহন। সহকর্মীদের খিস্তি। শহুরে ক্লান্তির শরীরী ভাষা। ব্যান্ডেল কাটোয়া লোকালের ফিরে আসা। ঘুমন্ত কলোনির ফিসফাস। ঝিমিয়ে পড়া মাংসের দোকান আর মায়া জীবনে মফস্বলের নিজস্ব ডাক।
নৈঃশব্দের তীক্ষ্ম স্বরে বেজে ওঠে অন্ধ বাউলের একতারা। সুরের প্রথম আলো। অর্থাৎ এক অর্থে যা কিছু পূর্ব পরিকল্পিত আধো ঈশ্বর এমন ভাবের জীবনে।
গৃহ দেবতার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবার দৃশ্যটি যেমন!
প্যারাসাইট: দু'টুকরো বেকারত্বের কাজ
শানু চৌধুরী
- No plans at all"
(১)
একটা কলোনি যেখানে আপনি দেখছেন মাথার কাছে নীচু হয়ে যাওয়া ছাদ আর বাসি সমস্ত খাবার নিয়ে বসে আছে এক ছোট্ট সংসার। যার জানালা আরও ছোট। যেখানে বসে মানুষগুলো দেখছে আরেক শ্রেণির মানুষের ভিতর। সেখানে আমি বা আপনি কোনোদিন যাবো না কারণ, আমরা আত্মসচেতন। আমরা কোনোদিন জানতে পারবো না ভিজে পিচ রাস্তারও কিছু কাতরতা আছে যা আমাদের চোখ থেকে ভুলিয়ে দিয়েছে সমাজের এক আশ্চর্য গোলক। সেই পরিবার। যার সদ্য যৌবনের দিকে পা দেওয়া দুটি মুখের দিকে আমরা কখনই তাকাবো না। যার তৃষ্ণা কেড়ে নিয়ে বেচে দিচ্ছে শ্রেণি নামের এক মহাদানবিক যন্ত্র। তোমার পথ কী? কোথায়? সে কথা তো পথ খুঁজবে না কোনোদিন। আমাদের নিজস্ব পলাতক চেহারা এক অমোঘ অনুসরণের দিকে ছুটে যাবে পরিকল্পনা অনুযায়ী। খিদেই আনে মানুষের অস্থিরতা। খিদেই আনে মানসিক আবেগ। যার ছায়ায় স্যাঁতস্যাতে ঘরে মহড়া দেয় চারটে ফাঁকা পেট! কর্মহীনতাই তো জীবনের মরুভূমি যেখানে প্রত্যহ শুকিয়ে যেতে যেতে কারও পিঠের চামড়া কুঁচকে যায়। এসব যে আমরা পাবো না নিয়মানুগ স্বপ্নের ক্যাটলগে তা জানতে আমাদের বোধের পাচন ফুরোতে পারে না। তার জন্য চাই খোলানল। আর অপরজন কখনই চাইবে না আপনি উপকার সাধক হিসেবে আসুন তার সামনে। তিনি যেটা চান তা হল আপনার প্রশ্নের তিরে একটি কথা " ছিনিয়ে খাবো।" আর সেখানেই পরজীবি মানুষের ভার দ্বিগুণ হয়ে যায়।
(২)
ঘরের গালিচা নেই, তাই আমাদের স্ফীত স্বপ্নের পরিবেশ এই পৃথিবীতে টিকবে না। আপনার ক্ষোভ জমলে আপনি বমি করেন? আপনার চোখে এঁটে থাকা লালিত এক দৃশ্যের ওপর। সেখানেই সদ্য যৌবন পরিকল্পনাকে ঠেলে দেয় প্রকৃতির চাবির কাছে। ঘুম হয়ে ওঠে ভয়ানক! বিলাসিতাকে সে চেখে দেখতে চায় সেই ছোট্ট সংসারের সাথে। তবু জীর্ণ পোশাক? তকমা হয়ে যায়। যার গন্ধ তৈরি করে শ্রেণিবিভাগ। সেই সন্দিগ্ধ হাওয়ার বদলে যাওয়ার আর অধিকারটুকু থাকে না। শুধু রোপণের অবকাশ ভুলে নিজেদের স্থানান্তরিত করতে হয় নিজের টিকে থাকার জন্য। এই তো লোভ! যা দুর্নিবার। পচা-গলা কাঠামোর উপর নিজেদের বাঁচতে চাওয়া শবদেহ তুলে রেখে তারা হতে চায় হন্তারক। আর চোখের সামনে ভেসে ওঠে অবিমিশ্র উৎপীড়নের ঘষাকাচ।
আসলে সুখ কী? অপর পিঠে দাঁড়িয়ে থাকা অসুখের অবয়ব? মানুষ আসলে আরেক মানুষের শরীরে ঢুকে যেতে চায়। যার পোশাক সে নিজে চিনতে চায় না। এই বাদামী রঙের সুখ! তার ভিতরেই একবুক কষ্ট! অথচ ব্যথার অনুভব নেই। সে ব্যথাকে সারিয়ে তুলতে চায় হাতড়ে বেড়ানো পথ্যের খোঁজে। যার টুংটাং শব্দে বেঁচে থাকা বলতে মনে পড়া ক্ষণিকের পৃথিবীতে একক মহড়া।
(৩)
আপনি বুঝতে পারেন আপনার ঘাম ঝরে পড়া এমন এক গণনযোগ্য দৃশ্য, যেখানে আপনি প্রোলেতারিয়েত আর আপনার ঘাম শুষে নেওয়া বস্তুটি ধনতান্ত্রিক বাস্তবতা।
এক সন্তান বলে ওঠে আমরা জন্মাই আমাদের অনিচ্ছায়। কিন্তু মৃত্যু? মৃত্যুর জন্য আমরা আমাদের জায়গা কি স্থির রাখতে পারি না? এই প্রশ্ন টিকে থাকতে পারে না পরিবেশে আমার ধারণা। যেখানে মেধাপাথর তুমি জড়িয়ে রাখলেও ভেঙে যায় পতন নামের দরজা আর উন্মুক্ত হয় পুরোনো জীবনের সেতু। রূপান্তরিত মানুষের পায়ের মাঝে বিকৃত হতে থাকে সমস্ত স্রোত। যার প্রবাহ নোংরা, যার কষ্টের দাগ আরেক স্পর্শকাতর মানুষের! তবে কান্না যেন এক, কোথাও রক্ত ওঠা মুখ আর সুখে টুকরো হয়ে যাওয়া বাক্যহীন মুখ! জ্বলছে নিভছে চাহনির মাঝে। তবু কম্পিত মাথা উঁচু করে ত্রান শিবিরের নীল আলোর রোঁয়া ওঠা বুকে। পৃথিবীর রক্ত উঠছে বুকে...ভালোবেসে পুষ্ট হচ্ছে কেউ আর ঘৃণা নিয়ে কেউ ডাকছে হত্যামগ্ন প্রহরের দ্বিতীয়ভাগে। আর সেই মেধাবী পাথর ডুবে যাচ্ছে স্বচ্ছ জলে টনটন করে ওঠা চোখ দেখতে দেখতে...
শুভঙ্কর ঘটক
একমাত্র
একমাত্র। --- একটি মোক্ষম হাতিয়ার। ---
#
একটি শব্দও। --- একার জীবন একটি কবিতা
একটি চিত্র ও একটি স্বপ্ন ও একটি কল্পও। ---
একটার বিস্তার ও একটির ক্ষেত্র । --- একটাই
বহুমাত্রিক ১ একমাত্র থাকা। ---
শূন্য। --- দশমিক। --- ভগ্নাংশ। --- পরিমান। ---
পরিণাম। --- একমাত্র
১। ---
এমন বিষন্ন অপরাহ্ন বেলা
এমন বিষন্ন অপরাহ্নবেলা
এমন স্নিগ্ধ ও পাখি যে দোয়েল
আশালতা নামে একটি মেয়ে ও
কী একটা ছেলে যে মেঘনাদ নাম
টান-টান সুতোমাত্র ১'এ বাঁধা
অপরটির গোলাপকুসুম যেমন
হল অন্যতম জবা অন্যটির
ন্যুব্জহল
শব্দ-কল্প-বীজ' ভারে ন্যুব্জ হল (অ)ব্যর্থও হল
একটির দ্বৈতখালে ডুব দিল অন্যটির মরা
শামুক কুড়িয়ে কালো মহাসাগরের ঢেউ মারি
দেখি এই দেশকাল থেকে মানুষ বিরত আছে
কোনোদিন পড়ব যে বই আমি
কোনোদিন পড়ব যে বই আমি সে বই আমার
ক্লাসিক মাছের ফিঙ্গার-এ যে কে অ্যাটলাস ভাই
এ পৃথিবীর অঘ্রাণে যাই আর ফিরে ফিরে আসি
অঙ্কুরোদগমে ছায়া পড়ে 'পাহাড় আমার স্নায়ু শিথিল হল
ওভালের দিকে বাংলার তাঁতশিল্প শিরোনামে ছিল
পুরুষটির কালোও ভেদ করে অনন্য ও মেয়েটির তামাটে গুদামঘরে
অক্ষম অব্যর্থ শব্দচয়নের মদনটাকে পৃথিবী যে চেনালো
সুপ্রভাত আলো জ্বেলে এসো সুপ্রভাত আলো জ্বেলে
স্নায়ুদুর্বল কবিতা ব্রক্ষকমলঊরুর দিকে যায়
আমার যে কিছুই বলার নেই হে হে হো হো
শুরু হল ১' আধার আর বীজের খেলা
একটি শাদা ঘোড়া ও একটি কালো ঘোড়া
একাধারে ডালপালা ওঁর শ্বাপদ অরণ্যে গভীর ও ঘনাইল কাল
নীড়িহারচঞ্চু
ঋণ: বিনয়মজুমদার
তিতিরের ডাকে সাড়া দিল বাকি দেখা হল নাই
ওঁর ঘন নীল চোখে পৃথিবীর সম্মোহনী জাদু
আছে এক ঝাঁক নীড়িহার চঞ্চু'র আঘাতে রাতে
একবার প্রবল সে অন্ধ হল একটি গুহায়
পনেরো বছর দীর্ঘ বিশেষ ধ্যানের পর দক্ষ
হল তাঁর আয়ু দিব্যজ্ঞান হল পরবর্তীকালে
লোকটি হারামি হল এবং ঋষিও নাকি ওঁ-ই
চয়ন দাশ
ডু নট ওপেন দ্য ডোর
আগেই বলছি এই লেখাতে নায়িকা নেই। তবু লেখা শুরু করার মুহূর্তে হঠাৎ একটা সিনেমার দার্জিলিংগামী ট্রেন এর দৃশ্য আমার কপালের কিংবা চোখের পাতার উলটো দিকে মনে পড়ছে। যেহেতু নায়িকার জন্য সর্বদায় উইন্ডো সিট রাখা থাকে তাই পাহাড়ি রাস্তায় ভাঁজ খুলে যাওয়া বাঁকগুলো, খাদগুলো, খাদের ওপারের জঙ্গল আর সরু- মোটা বসতিগুলো কারুর ঘাড় টপকে তাঁকে দেখতে হয় না, তিনি স্মুথলি দেখছেন এবং দারুণ বিস্মিত হচ্ছেন। মাঝে মাঝে বাইনোকুলারও চোখে দিচ্ছেন। এই দৃশ্যে যদিও কোনো ট্রেনের পাশে পাশে চলতে থাকা নায়কের জিপ গাড়ি নেই। ব্যাকগ্রাউন্ডে কিশোর কুমারের কণ্ঠ। বাতাসিয়া লুপ এসে যাচ্ছে। এইখানে এসে টয়ট্রেন একপাক খাবে। “ মে হুন ঝুম ঝুম ঝুমরু …” । নায়িকা মধুবালা।
হঠাৎ দার্জিলিং এলো কোথা থেকে ! অপ্রাসঙ্গিক তবুও প্রাসঙ্গিক। আসলে এই সংখ্যা বেকার সংখ্যা। যেখানে আমরা দেখছি জীবনের অস্তিত্বের চরম বা প্রায়-চরম বিন্দুগুলো । একটা মানসিক এবং মানবিক স্থিতিস্থাপকতা আমরা খুঁজছি। আপনার চোখ টেলিস্কোপ ও মাইক্রোস্কোপের উভয়ের অস্তিত্বকেই যাতে স্বীকার করতে সম্মত হয়। আমরা সকলেই জানি, create something from nothing । আমরা সবাই একটা শূন্যের কারখানার কর্মচারী মাত্র। তবে এই পৃথিবী নিজেই এক চূড়ান্ত অস্তিত্বের প্রমাণ। তাই জগতে শর্তসাপেক্ষে সবই সুন্দর এবং স্বাভাবিক । এনটিটি আর এটারনিটি দুটো স্রোতই মিশে গেছে কোথাও কোনো একখানে।
দার্জিলিং আসছে… খাদ আসছে… গান আসছে। অঞ্জন তাই আসবে, অঞ্জন দত্ত। অঞ্জন দত্ত এর উল্লেখ বেকার সংখ্যায় উঠে আসছে কেননা তিনিও জীবনের এক কার্টোগ্রাফার। ঐ যে আগেই বলছিলাম, থাকা না থাকার কথাবার্তা । একটা মানুষকে গড়ে তোলে যেমন তার শহর, মানুষের গায়ে লেপে দেয় শহরের নিজস্ব চুনো মাছের গন্ধ মজা পাঁকের গন্ধ, মানুষ কোনোদিন সেই গন্ধ লুকোতে পারেনি। শহর মুচকি মুচকি হাসে দেখে যারা লুকিয়ে রাখতে চায় সেসব। যারা রাজপথে ঘুরে বেড়াতে চান ঠাণ্ডা ঠাণ্ডায় , চান শহরে কেবল জলকাদা না হওয়া বৃষ্টি হোক , ঘরের ভেতর থাকলেই গাছ পালক ছড়ায় বলে চক্রান্ত করেন তার হত্যার আর বাইরে বের হলে পালকওয়ালা গাছ খোঁজেন … তাদের কাছে একটা গান একটা সিনেমা একটা ছবি একটা কবিতা উপন্যাস ঝটতি মাপকাঠি এন্টারটেনমেন্ট কোশেন্ট , আহ! আরাম… । তারা কোনোদিন জানতেই পারবেন না, এই শহরে এমনও কিছু মানুষজন আছেন যারা শহরটার গায়েই তাদের গন্ধটা লাগিয়ে দেন। তারা কোথায় থাকেন কিরকম দেখতে … । হয়তো অঞ্জন এই মানুষগুলো দেখতেই বেরিয়ে পড়েছেন। প্রকৃত শিক্ষা আমাদের কখনো সজ্ঞানে আসে না , আমরা অতিসাধারন ভাবে উদ্দেশ্যহীন ভাবে আমরা অজান্তে এগিয়ে চলার পর বুঝি … এই ঘটনাক্রম আসলে আমাদের কী শেখাল। এই শেখাটা মজার। এই শেখার শেখাটার সুযোগ সবার জন্য নয়। শিখে গেলে পৃথিবীতে কোনো বেকার বলে কিছুই হয় না।
হালকা কখনো জোরে বৃষ্টি পড়ছে, দেখছি। গলি থেকে একটা মেয়ে বেড়িয়ে পড়েছে ঘর থেকে। হয়তো পালিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে রমা। বাঁ দিকের কাঁধে ছোটো একটা ব্যাগ, সবুজ সালোয়ার। সবুজ সালোয়ার … জয়িতাও হতে পারে। গলির মুখটা একটু ঘুরে রাস্তা। একটা হলুদ ট্যাক্সির পেছনের একটা দরজা খোলা। রমা বাড়ি থেকে পালাচ্ছে, জয়িতা হয়তো কোনো বড়োবাড়িতে রান্নার কাজ পেয়ে দূরে চলে যাচ্ছে, মেঘ চলে যাচ্ছে, সম্পর্ক কান্না দুঃখ হাওয়া জলাজমি চলে যাচ্ছে। কে কোথায় যাচ্ছে তা নিয়ে কারুর কোনো মাতামাতি নেই খোঁজ নেই শোক নেই । কোথাও একটা হয়তো যাচ্ছে, একমাত্র ওরাই জানে সেটা। হয়তো একটা কালো অডিটোরিয়ামের মধ্যে তারা ঢুকে যাচ্ছে। গ্যালারির ভেতর কারা আছে কেউ জানে না। অথচ তীব্র চিৎকার। হাততালি আর গালাগালির ফারাক বোঝা যাচ্ছে না। এতো আওয়াজের ভেতর আমরা আমাদেরকেই আর চিনতে পারছি না । আমাদের মধ্যে থাকা ফুলদানি ভেঙে ফুল আর জল আলাদা হয়ে যাচ্ছে। একে অন্যের গায়ে হাত তুলতে তুলতে আমাদের নখ আর বাড়ে না এখন। তবু মানুষ সাজার খেলা আজও চলছে, মানুষমানুষ গন্ধের সিনেমা বানানো বন্ধ হয়নি, সেখানে রাজা রায়েরা কোনো চরিত্রের জন্যই ফিট হয়না কোনোদিন। সিনেমায় গানের চল বেড়েছে দুষ্টু গানের চল বেড়েছে। মাঝেমাঝে মনে হয় পায়ের তলার সময়টা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে নরম হয়ে যাচ্ছে । নিজেকে প্রশ্নের কাছে আমিই উত্তর আমিই অজুহাত।
অঞ্জন দত্তের গান বলতে যারা রঞ্জনা আর বেলা বোস আর টেনেটুনে আমি বৃষ্টি দেখেছি বোঝেন, নিশ্চিত তারা বেকার সংখ্যার পাঠক নন, তারা লেখার এতোটা নিচে কি লেখা আছে জানবেন না। কেননা তাদের জীবনের পরিধি বিস্তৃত নয়। তারা রাজা রাণী রাম্বোদের উপস্থিতি কোনোদিন অনুভব করতে পারেন না। ফুটপাথ যেন জংলা পাড়ের ঢাকেশ্বরী শাড়ী। কত পথশিশু একসাথে একটা সাবানেই রাস্তার কলের জলে বিকেলে চান করে। ফেনায় ধুয়ে যায় শহরের হতাশা ক্লান্তি। ট্রাম ফিরে আসে। শেষ সিটে স্যমসান বসে আছে। ও পাঁচতারা হোটেলে সস্তায় সুর বাজিয়ে ক্লান্ত। নিয়ন আলো জ্বলে রাত পুরো নীল। ফাঁকা গলির অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা গন্ধ, কোনো এক ঘুপচি ঘরে চাচার পিঠ মালিশ দিতে দিতে ঘুমে ঢুলছে আলিবাবাসহ গোটা শহর।
ফুসফুসে হাওয়া কম ঢুকে আজ আমাদের সকলের মনখারাপের অসুখ। আমাদের চাপা চাপগুলো নিয়ে বেঁচে থাকতে আমরা সবাই অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আমরা জেনে গেছি কীভাবে এই চাপগুলো গুপ্ত সুড়ঙ্গের মধ্যে দিয়ে অন্যদিকে পাচার করে দিতে হয়। এখন একটা ক্ষণস্থায়ী মুহূর্তকে আঁকড়ে ধরে বাঁচি। সকালের সাথে বিকেলের কোন মিল নেই আমাদের। চাহিদা বদলে যায়। পৃথিবীতে বিপ্লব দীর্ঘজীবী হয় না , চতুরেরা দীর্ঘজীবী হয়। চতুরের কাছে বুদ্ধিমান আর বোকার কোনো ফারাক নেই। তাই মানুষ সাপ আর ব্যাঙ উভয়ের মুখে চুমু খেতে খেতে আজ মধ্যবিত্ত গিনিপিগ। বিশ্বের জঞ্জাল গেলাবার জন্য তৈরি চটকদার রেসিপি। আছে যুক্তি তক্ক আর ঝগড়া, চায়ের কাপে আগামী সরকারের মুলমুখ কে হবেন- ধর্ষণ কেন ভিনধর্মী করল, ধর্ষক ও ধর্ষিতার ধর্ম কী ? – ফলিডলের বিক্রি বাড়ছে বেকারত্ব কমছে- মিছিমিছি শত্রু তৈরি করে লড়াই লড়াই খেলা- দেশ ও প্রেম ভালোবাসা – দেশের শ্রম হিসাবহীন … চলছে ঝগড়া তক্ক যুক্তিশূন্য যুক্তি।
বেঁচে থাকা এক খরচের খতিয়ান আর বেকারত্ব সঞ্চয়ের। জীবন এক সুপ্ত সহস্রধারা , কোনখানে পা রাখলে কী হয় আমরা কতজনই আর ঠিকঠাকভাবে বলতে পারি ! সময় পেরোয়, ভয় কেটে যায়- কান্নায় লজ্জা আসে- প্রিয়মানুষকে একদিন হারাতেই হবে বলে মানসিক প্রস্তুতি থাকে- হাতের মুঠোর স্বপ্ন বেহাত হয়। এইসব যাবতীয় কষ্ট কান্না হতাশা অভিমান একদিন অব্জেক্টিফাই হয়ে যায় বা যাবে। কেউ প্রথমবার ছাদে মাদুর পেতে আকাশ দেখতে শোয়, কেউ নদী
পাহাড় বিকেলের মেঘ দেখে, কেউ বা প্রথম সিগারেট, গান গাইতে কবিতা লিখতে শেখে। কথা বলার মন তৈরি হয়। নিজেকে প্রশ্ন করার সাধ হয়। একটুখানি বাঁচা তারজন্য হাজারো আপোস ঘিরে ধরছে। এই আপোসগুলোই আমাদের দ্বিচারিতা।
মানুষের মধ্যে বয়স বাড়ছে তবু প্রশ্ন করার সাহস হারিয়ে ফেলছে দিনে দিনে। নিয়মভাঙার মন ভেঙে গেছে আগেই। কোনো এক খবরের কাগজে দেশের প্রধান শহরগুলোর রুম ডেনসিটির পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে। অর্থাৎ একটা রুমে গড়ে কতজন থাকেন। মানুষ গিজগিজ করছে কংক্রিটের চৌকো বাড়ির পেটের ভেতর। মানুষের বুকের ভেতর এখনও অক্সিজেন আসছে, হাতের তালুতে পয়সা আসছে, পাকস্থলিতে রুটি আসছে … সবই আসছে তবে অপর্যাপ্ত ও কমছে। জানালা বন্ধ করলে বা খুললে এসব দৃশ্য বদলাবে না। জং ধরছে পৃথিবীর গায়ে। খেলার ছলে খেলার মাঠে রাখা আছে সারি সারি গাড়ি। বাচ্চারা সকাল থেকে বিকেল অবধি স্কুলে আটকা। বাচ্চাগুলোর আশপাশ থেকে আত্মীয়ের দলকে কোনো মন্ত্রবলে হালকা করে দিয়েছেন তাদের মা বাবারা , তাই দায়িত্বও নেই জীবনে।
স্কুলজীবন হারিয়ে ফেলা, বেকারজীবন হারিয়ে ফেলা মানেই ম্যাজিক দন্ডের সম্মুখ ভোঁতা হয়ে যাওয়া। বাকি সময়টুকু স্রেফ প্যাশনটাকে কে কতক্ষণ সাসটেন করতে পারছেন তার দেখনদারি বা দুনিয়াদারি। চোখ বুঁজে লেবু লজেন্স ফ্রুটকেক খেতে খেতে হরিপদ কেরানি হওয়ার স্বপ্ন অনেকেই দেখতে চান । পান ক’জন ? আমাদের সকলেরই মাথার উপর পরানো আছে অদৃশ্য কাগজের টুপি, তাই সবকিছুই আমাদের সীমিত, মাপা। নিজেরাই নিজেদের রিমেক করি রিমিক্স করি ও মজা পাই।
[ এই লেখাটি কেবলমাত্র অঞ্জন দত্তের জন্যই লেখা, ওর গান না শুনলে ছবি ও অভিনয় না দেখলে হয়তো আমার কিছু অনুভূতি কমজোরি হত। ওঁকে শ্রদ্ধা রইল। তবু এক ছোট্ট লেখাটুকু লিখতে অঞ্জনের যে গানগুলোর কথা বা ভাবনার প্রতি ঋণী বা কৃতজ্ঞ থাকবো আজীবন সেগুলি হল – শুনতে কি চাও, হরিপদ, খ্যাপার শহর, ম্যারি অ্যান, কলকাতা ১৬, চ্যাপটা গোলাপ, আমি বৃষ্টি দেখেছি, স্যামসন, ভালোবাসি তোমায়, আলিবাবা, রমা, মাসের প্রথম দিনটা, ঘর, ঝগড়া, সকাল বেলার খিদে, রাজা রায়, রাজারানি রাম্বো, যাচ্ছে চলে, দুটো মানুষ, আমার জানলা, আকাশ ভরা, জয়িতা, বসে আছি ইস্টিশানে, ছেলেটা, টিভি দেখোনা, নেপালি পানশালা। যদিও এটা অনেকখানি দুরে ঘোরা ফ্যান থেকে ফিনকি ফিনকি হাওয়া পাওয়ার মত … আভাসমাত্র । সামগ্রিক কাজ নয়। হবে হয়তো। কোনোদিন … আশা রাখি ]
রথীন বণিক
★আত্মজ বোহেমিয়ান
একটা সরকার যে কোনো রাজ্যের কিংবা ইন্দ্রিয় যখন জোরের সঙ্গে ঘোষণা করে বেকারদের জন্য আমাদের সরকার এই এই পদক্ষেপ করেছে তার মধ্যে অন্যতম সরাসরি ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে এককালীন এত এত ভাতা তখন বড্ড কষ্ট হয় ভোটের রাজনীতির অয়দিপাউসকে দেখে ডট ডট
কারন মোটা সভ্যতার আটচালায় আমার প্যান্ট জামা বড্ড ঢিলে তামাক ক্যান্সারে এখন কিরকম লুটোপুটি সরকার শুধুই কি ফারেনহাইটে
অঙ্কলজির ওরিয়েন্টাল নিতান্ত অডিনারি বস্তু রগড়ে ইদানিং বেড়েছে জলখাবার বেকারত্ব। প্রিয়ার এজলাস চাইলে গ্লাস গুটিকতক আর ছুটে আসে না হয়তো মনের জোর এই ধরুন দেহের জোরকে গুতিয়েছে সবে একুশ বাইশ বছর ঢাকার মুখটি তখনও যুদ্ধ হয়নি আসেনি রাজাকার টাউনে
বেকারত্বের নির্জীব অনুশীলন চুঁচুড়াতে ঠায় দাঁড়িয়ে দায়িত্ব ওসামা বিন লাদেন লিখবই আহ্লাদে
ঋক বৈদিক সভ্যতায় আমাদের আবাহন কেউ মনে রাখে না প্রতিষ্ঠানে সার্টিফিকেটের নির্ভুল থাবায় নিয়তি আমাকে কেলিয়েছে বেহুঁশ করে টেটিয়া পাইপে মাইক ব্যস্ততম রমরমা লাভিউ চিৎকারে একটুখানি মীরজাফর
সকল ধকল সহ্য করে মন টার্মে তেজী বন
এক ভারে বর্ধিষ্ণু যদি শেপ উৎপাটন লাইফে রামানুজ কোটায় হবে চাকুরিরতার স্বাস্থ্যকর...
দাঁড়া রাস্তায় বেড়ো না চড়িয়ে পেপার বেশ তিতো পরিযায়ী
রক গেটে ছুটি মল আটটা নটা কম পানি বিজেপি তো সব চেনেল কিনে নিয়েছে নদীর হয়ে কথা বলছে কোনো পার্টি সত্যিকারে ভাব না বরাবর ১০৮ অংশুমান
গাঁটের ব্যথায় বললেই হবে বেড়ো কাল কায়দা বোকাচোদা নিরীহ
বদলে মনের বিক্ষিপ্ত কার ঔকার আর্থিক ভাবে দুর্বল
বন্ধন অপারেটিভ দৈনিক হাঁড়িতে ছাদের আর্য নিহারিকা সেবনে পুরোপুরি পাগল
ইতু কুঁজোয় যৌক্তিক গবেষণা অবোলা ম্যাগি মশলা দোকানে কর্নিয়া লুণ্ঠন ধর্মমঙ্গল বেকারো শিবের হত্যা খবর পড়ছে ইটভাটার এখন
যাবতীয় শ্রম এঁকে সরকার লিফটি শালিখ আমি অজ্ঞ কুসংস্কারে মহামতি পণ্ডিতদের মনে করার চেষ্টা করে তখন সবে দ্বিতীয় রাজসিংহাসনে রাজকর আদায়ে ব্যস্ত প্রোটন ইলেকট্রন ইলেকট্রিসিটি আষাঢ় আগেও পাইক বরকন্দাজ আহুতি ইহুদিদের দেবতা কোনো এককালে বর্বর আমার বেকার হয়ে ওঠাগুলোকে গিলে খেত তবু লিমিটেড মেতে যাবতীয় জল জমা রাস্তা আপনি খনার বচন খুললেও দেখতে পাবেন আজকের বিষুবরেখা সন্তান সব বোবা অণুজীব অণ্ডকোষের হবে তার ধরে হ্যাচকা টানলো কৃষি খেতরে গম এলো কুইনটা তখনও টাল সামলে আসতে পারেনি ওসিভর্তি চিবুক বাবাজীবন
ফ্রয়েডে এদেশের মানুষ এখনও এঁটে ওঠে না নাকোচ পাদায় দিনে তো কত কাঁচা ছোলা বেসন বন্ধ করে দাও ধেড়ে কাণ্ড সরযূ নদীর রাম সীতার অ্যালকোহল সবই হাওয়া জেরুজালেম যেদিন থেকে মঙ্গল গ্রহ খুঁড়ে খেতে শিখেছে তবে থেকে বেশি ইস্কুল দিই না
বছরে বাবা থামবে জিরো মাইনাসে তেষ্টা বিবাহব্যবোসথার অংশুমান তবে বিয়ে দাসত্বের ইংরেজি কেজি কেজি রেনেসাঁর জন্মান্ধ বাবাই কথা না বলে কেক কাটো পেত্রার্ক সনেটে বোকা চিও ঠিকঠাক ঢাকনা না চেবানো হলেও প্লাস নাচে আনকালচার গুরুত্বপূর্ণ গানে খাপকা রাজহাঁস গ্রীষ্ম
অবাঙালি নিজেদের বেকার অবস্থা কাটাতে রবীন্দ্র চোদে বছর বছর করুণানিধান কোনো হোমযজ্ঞের কেনডি পক নয় বৃক্ষরোপণে আবৃত্তিগুলো শাশ্বত সঙ্গীত হয়ে ওঠে না গুরি গুরি মেঘ ঘাগড়া পড়ে বৃষ্টিপাত দেখে আর দেখে বাঙালির পেটি বুর্জোয়া
পটল চাবুক টিভিতে ঘেঁটে চিত্তরঞ্জন যশোদা কৃষ্ণের জন্মের পরিস্থিতি মধু রাতেও যে জন্য ঝুনো বৃষ্টি জনপ্রিয় আরাকান রাজসভায় ইসের দোকান থেকে সাদা নুন হলুদ বিশ্বযুদ্ধের আগের অবস্থায় যার মান ছুটছে লৌহতেলে কর্দমাক্ত পতাকায় গিয়ে পড়ছে হোমোফোবিয়া অস্ট্রিক জনগোষ্ঠীর প্রাচীন রোগগুলো আমি দেখছি কীভাবে আমাদের শরীরেও ঈশ্বরের মতোন চাঁদ সদাগর ঝড় তুফানে মনসা ক্ষমতাবান কিন্তু কৃমি বিপদ থেকে হাতে নীলে ধুঁয়ে ফেলতে হয় অনন্য বাকরাশি জরুরি অবস্থার বিনিয়োগ বলতে বেকার অনেক আগে ঢুকেছে বট্টিশেলী ডিনাইয়ে রসুল ইয়ার ধ্বজ
উদ্ভিদে প্রসাদ আন্তর্জাতিক শান্ত ওদের নিশ্বাস প্রশ্বাস গৃহস্থালি রবীন্দ্রনাথ শিয়ালদহ পর্বে ঘ্রাণ দিয়ে বুঝেছিল আজকালকার বুদ্ধিজীবী কঠোর তপস্যা করলেও ফিরে যেতে পারবে না তপোবন কালিদাস তো আমার নর্মাল স্টাইল যখন তখন দাউ দাউ এলো তবু ফোনে বসে কেটেছি সিগারেট আমার মাকে খানকি কিংবা সন্ধ্যার আগে মাতৃভাষা কতটা মাদারচোদ হয়ে উঠেছে কেউ জানলো না আদিম কথিত ঢক্কানিনাদ সারিগান ভদ্রনমস্যকতায় শোয়াশুয়ি ছুরি এক্ষুনি শিকনি হাতের কবিতায় গদি এক বিচিত্র জীব বিবেকামনদোও বলতেন আর বলতে বলতে বিলেতি মদে চোখ ফুলতো বালক ব্যবস্থার এইটা চারদিক
ভাউচারে ব্রহ্ম বৈবর্ত যাচ্ছি তোমার এক ডাকে শনিদেবতাও আমার সঙ্গম ছুঁতে পারবে না কারণ তো থ্রু টেন এইচডি ছবি নামটা কাঠি লজেন ঠেকনা দিয়ে দ্বিতীয় পোল বেহায়া বাজাচ্ছে জল হাতে কি সুন্দর স্টেপলার এসে গেছে রাজপুততুর ফর্মুলা অনুযায়ী হরে রাম মানুষের চেয়েও বেকার ওষুধ দেয়নি কোনো পরশুদিনে
হয়েছিল তো শুধু সীতা মাতার গরম ভাত তা দিলে একটু জিভ শুশ্রূষা পায় অতবড়ো জনকভবন সাঁতরে আজকের স্যানিটাইজ হরমোন যৌনব্যবস্থাকে কেমন বেমানান করে দিচ্ছে কোনো ওষুধ আছে সুর এবং অসুরে শিলারাশি চারকোল অর্থ পেল না হলে রেশিও দাদা আপনারাই বলুন রাশিফলে জীবিকা কৃষিব্যবস্থা কতটা দূরে বেড়ায়
আমাদের প্রাচীন নাভি বিশ্বাস হামি খাবে বলে ট্রাই সৌ রাশিয়া ফেলনা বলবো না এই সকল প্রাচীন বিশ্বাসকে এগুলো ধরে ধরেই নর্ডিক আজকের আমি তুমি সে গোঁড়ামি গোঁফে লাতিন আমেরিকা কত সাহিত্য সময়ে অসময়ে বড় লোভেরা বোঝাই যাচ্ছে রাইবোজোমে গুরুজন বলেন চিন্তাকে ওভাবে চোবালে বেকার হয় অশ্বথ ফণিমনসা অতএব একটা মান শুকে গাছেদের পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র হতে পারে না যেটা অবলা বসুকে মরার আগেও বলেছিল জগদীশ সেই সব বিজ্ঞান নিয়ে কেউ বিজ্ঞাপন করলো না এটাই আফসোস পপকন খেতে খেতে বামুনের চাঁদনিচকে আমার জীবনযাপন অচ্ছুত অসহ্য ডাল দেব নমঃশূদ্র ঘটিত শ্রাদ্ধে পিতৃকুল ভালো হিসাবনিকেশ জানতো না ক্যালসিয়ামে ঘাটতি তারো একটা কারণ আনুমানিক এতো বেশি আমাদের ইতিহাসে শোবো কোথায়
বুদ্ধ পূর্ণিমায় সঙ্ঘের একাধিপত্য প্রদীপের তেলের মতো বারবার আমাকে খাটো করে যায় তবুও তাতে আমার হাসখাস নেই এ বাঙালিরা ইংরেজ আসার আগেও খাটো ছিল ছিল আড্ডাবাজ শনিবারে আপনারা কি দেখেননি সজনীকান্তকে। যতটা কবিতা পড়লে সকলকে জেনতো লাগে তার কোনোটা ঘাস শোয়াই ইলিয়াসে বাঙালির হম্বিতম্বি নীচু শ্মশান
রথীন গুচ্ছের কবিতায় রোমান ক্যাথলিক ধর্মের স্বয়ং দশে বা
তোমাদের বলেছি না আর রথীনকে নিয়ে বলো না তার জগৎ অনেক সীমিত তোমরাই ধরে ধরে বড় করে ফেলছো কিস্তিতে কিস্তিতে চমকাচ্ছে না দশক অহর্নিশ আবার এলো ফোন এই ফোনটা এরোপ্লেন সোজা আমাকে আদালতের সামনে নিয়ে যাবে সভা ভর্তি লোক আজ ফয়সালা হবে বেকার অতো রথীনের। বলেছে একটু থেমে যদি হাওয়া সকরি গ্রীস সাইকেলে দেশলাই এ সব ভোঁতাকে অ্যারিস্টটলো মানুষ করতে পারবে না যমের মতো নচিকেতা লিখবে বৃদ্ধাশ্রম তারপর গান হবে পাড়ার মোড়ে বিদেশে যাওয়া ছেলেটার অশ্রু আসবে না সবরমতীতে মদ না দিলে খিস্তি খাবে গোটা রাজ্য তবুও বেকার হবে না আমাদের টিনএজ রাঘব বোয়াল সুতরাং বেকার হাওয়ার ম্যাজিক ম্যাজিস্ট্রেট অবধি পৌঁছাবে কি
মিনিট কুড়ি অপেক্ষার মাঝে
জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়
এখন দিন কয়েক এই চাপটা যাবে। মা চোখের জল মুছবে, বাবাও কথা বলবে না। স্বাভাবিক।
আত্মীয়রা এমনিতেই কোনো দরকারে পাশে থাকে না... কিন্তু এগুলো ঠিক জিজ্ঞেস করবে। আর পাড়ার লোকদের তো কথাই নেই। বাবা ওষুধ কিনতেও যেতে পারবে না কদিন। মাথা নীচু করে অন্য পাড়ার দোকান থেকে জিনিস কিনে আনবে। চেনা দোকান, দেখলেই জিজ্ঞেস করবে। অথচ এরা সবাই জানে... পাড়ায় আমি একা পার্টির কাজ করি না। আর এসব কেসও নতুন কিছু না। এদের আসলে রগড় চাই। খোরাক চাই। "ছেলে জেল খেটে এসেছে", খবর ঠান্ডা হওয়ার আগে অবধি উলটে-পালটে, নেড়ে-ঘেঁটে খেতে হবে।
জেল-ফেরত নই! আমার বাবা মোটেও জামিন দিয়ে ছাড়ায়নি! কোনো কেস-ই হয়নি, লক-আপে ছিলাম শুধু এক রাত... ধমকি দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। আগে অন্যরা গেছে... এবারে আমাদের ধরেছিল। এ তো হতেই পারে! তবু কিছু লোক রগড়াবে ব্যাপারটা নিয়ে। কারোর কোনো কাজে এলে মনে থাকে না... পড়ে দরকারের সময়ে ফাটলে এসব ভুলেই আসবে; কিন্তু কচলানোর অভ্যেসটা যাবে না। আর ওরা যতদিন কচলাবে, ততদিন ঘরের পরিবেশ এরকম থাকবে। এমনিতেও, ঘরে থাকার ইচ্ছেটা চলে গেছে... খেতে আর শুতে যাই।
যাদের সঙ্গে স্কুলে পড়তাম, তারা প্রায় কেউই খোঁজ রাখে না আর। আর যাদের সঙ্গে পাড়ায় খেলতাম, তাদের মধ্যে হাতে-গোণা মালের মুখ দেখতে পাই। তাও কথা কম, কষ্ট করে হাসে। ভাবে -- টাকা-ফাকা ধার চাইবে। কলেজের ছেলে-মেয়েগুলোর কথা না বলাই ভাল। ছবিগুলোই ভাল... মানে, শুধু ওইগুলোই এখনো যা কিছু ভাল। ফ্রেন্ডলিস্টে আছে, নিজেদের ছবি পোস্ট করে... দেখি। আমিও ডাকি না... ওরাও খোঁজ নেয় না। কেমন আছিস? এর পরেই 'কী করছিস' আসে।মুশকিল।
ঠিক মন খারাপ না, অবাকও হই না... তবে কিছু একটা তো হয়! বেড়াতে যাচ্ছে, ডিনারে যাচ্ছে... বর-বাচ্চার সঙ্গে দিনে চারটে করে ছবি দিচ্ছে -- দেখি। ভাবি, এরাই রাত জেগে ম্যাসেজ করত? রিপ্লাই না পেলে কান্নাকাটি করত?
পুরোনো ফোন অকেজো হয় গেছে... সেই সব ভুল সম্পর্কগুলোও। তাও দু-তিনটে ফোন নম্বর ভুলতে পারিনি। সেই সিম এখনও আছে না গেছে জানি না... অথচ নাম্বারটা মন থেকে যায় না।
ভালো থাকার অধিকার সবার... ঠিকই। তবে ভালো চাকরি-বাকরি করা চারটে মেয়ে দেখে তাদের একজনকে পছন্দ করার কথা বললে লোকে জুতোবে। ওটা জেন্ডার ইকোয়ালিটির কথা নয়। ঘরোয়া ছেলে চাই, 'গৃহস্বামী' হয়ে থাকার জন্য... এমনও দেখি না। আর পুরোনো অ্যালবামে ছোটবেলার ছবিগুলো দেখলে বুঝতে পারি... আমিও আর 'সুশ্রী' নেই। অনেক পালটে গেছি। মোটকথা... ওটা হবেই না।
সিরিয়াসলি নেওয়ার মত কিছু না... একা বসে থাকতে থাকতে তো এমন কত কথাই মাথায় আসে... চলেও যায়।
দেখে নেওয়ার ইচ্ছে, পাপ-চিন্তা, অপরাধ বোধ, হতাশা... আসলে এমন ভাবে সব দিকে থেকে বুঝিয়ে দিয়েছে, ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্স ঘাপটি মেরে বসেই থাকে। নিজেরই খারাপ লাগে... কী করব!
মদ খেয়ে, তামাক খেয়ে, হাত মেরে... হালকা হয়ে যাই।
--- --- ---
চেষ্টা করতাম... মানে এখনো করি। ঘরে বসে থাকি না।
ফার্স্ট ইয়ার থেকেই দু-তিনটে ছেলেকে পড়াতাম। প্রথম মাসের সব টাকা মা-কে দিয়েছিলাম... মা তার থেকে একশো টাকা নিয়ে বাকিটা দিয়ে দিল। দু-তিনটে থেকে পাঁচ-ছটা অবধি বেড়েছিল। তারপর একজন হিসেবে করে দেখাল, এতে হাত খরচ চলে... সংসার চলে না। বাবা মুখে বলত না... তবে বুঝতে পারতাম -- এবার একটা ঠেকো দরকার। বোনও তখন মাধ্যমিকের দিকে এগোচ্ছে। একসঙ্গে দু-তিনটে জিনিস ভাবতে গিয়ে ঘেঁটে গেলাম। ফান্ডিং নেই, এক্সপিরিয়েন্স নেই... ধারণাও নেই। যে যা পারে বুঝিয়ে গেল। পাড়ায় তখনই বোর্ড ঝোলানো মিন্টু-পল্টু-প্রকাশ এইসব 'দা'দের কোচিং। আমার নাকি আর বাড়বে না ছেলে। বাজে ইনভেস্টমেন্ট হবে। কথাটা খুব একটা মিথ্যে না, নতুন ব্যাচে ছেলে কমে গেল। আর একে-তাকে ধরে ছেলে চাইতে গেলে এমন ভাবে 'দেখছি, জানাব' করত... নিতে পারতাম না। সরকারি চাকরির পরীক্ষা, ব্যাংক-এর চাকরির ফর্ম জমা... এসব করতাম। এক জায়গায় চাকরি পাওয়ার কোর্সও করেছিলাম জমানো টাকায়। ওই হচ্ছে... হবে... অনেকেরই তো হয় -- এই ব্যাপার। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে কেটে গেল তিন-চারটে বছর। চেনা পরিচিত লোকজন এদিক ওদিক সরে গেল।
স্টেডি রিলেশন... বাইরে পড়তে চলে গেল। তারপর ভো-কাট্টা। নিজের ফিকিরে আর রোজগারের ধান্দায় এমন লেগে গেলাম... নেশার মত হয়ে গেল। নেশার ঘোরেও ভাবতাম... কী ভাবে এদিক ওদিক থেকে কিছু সেটিং করা যায়। ক্লাবের ছেলেগুলো এখনো বলে... আমি নাকি আউট হয়ে গেলে একের পর এক প্ল্যান শুনিয়ে কানের পোকা বার করে দিই! মা-ও ঘরে কানের পোকা বার করে দেয় মাঝে মাঝে... কেন আর লেখাপড়া করলাম না। এই অর্ডিনারি গ্র্যাজুয়েশন নিয়ে কী ছিঁড়ব। না... ছেঁড়ার কথা বলে না, ওটা আমি বুঝে নিই। আসলে আমি কিছু করেই কিছু ছিঁড়তে পারব না... ওটাই জিস্ট।
সবাই ধরেই নিল... কিছু করে না। এ যে কদিন সাইবার ক্যাফেতে বসতাম, জেরক্সের কাজে হাত লাগিয়েও কিছু আসত... এই যে ক্যাটারিং-এর কাজে বিয়ে বাড়িগুলোতে যাচ্ছি, নিজের ক্যাটারিং সার্ভিস করার প্ল্যান করছি... কোথাও হার্ড-ওয়ারের জিনিস লাগলে ব্যবস্থা করে দিচ্ছি... টুকটাক ফ্ল্যাটের দালালী করছি... এগুলো যেন কোনো কাজ না! যা আসে তাই মা-কে দিয়ে দিই। বাবা নেবে না। নেয় না... কথাই বলে না ঠিক করে। আমিও বলি না।
এখন মন দিয়ে পার্টির কাজটা করছি, বাজার ভাল না... এখন যে ডিউটি দেবে তার ভ্যালু আছে। দাদার কাছাকাছি দাঁড়াই... যাতে মাঝে মাঝেই চোখ পড়ি। দাদা বলেছে একটা কনট্র্যাক্টের কাজে লাগিয়ে দেবে এইসব ক্যাচাল মিটলে। এখন থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে গেছে ছেলেরা... যে যার ধান্দায়। একবার একটা কাজ পেয়ে যাই... সিভিক পুলিশ-টুলিশ বানিয়ে দিক... তারপর কিছু মালকে ধরে বাটাম দেব।
কিন্তু এই আড়াই-ঢ্যামনা পাড়ার লোকগুলোকে ধরে আনফ্রেন্ড আর ব্লক করে দেওয়া যায় না। সেই হারামিদের দেখতে হবে রাস্তায় বেরোলে। ঝাঁটগুলোকে পুরো চেঁচে দিতে হয় ধরে!
--- --- ---
তবে এই চাপটা কদিন থাকবে। খুব দরকার না পড়লে রাস্তায় থাকছি না। ঘরেও থাকছি না... ক্লাবের ভেতর। বোন কলেজে ঢুকেছে... কোন পার্টিতে আছি, কী করি... এগুলো নাকি ওর জন্য খারাপ। বোনও কথা বলা কমিয়ে দিয়েছে, হয়তো একদিন অকেজো ফোন নম্বরের মতই মুছে দেবে।
অনেকদিন আগে এক মনের ডাক্তারকে বলতে শুনেছিলাম -- আমাদের ডিপ্রেশনের আশি শতাংশই হল সেইসব দুশ্চিন্তা নিয়ে... যা ঘটেনি, ঘটতে পারে।
যা ভেবে ডিপ্রেশন আসে, তার অনেক কিছুই ঘটেনি। কিন্তু একেবারেই কি কিছু ঘটেনি? ঘটবে না?
পজিটিভ থাকার চেষ্টা করি... যাতে যার উপকার হয়, করার চেষ্টা করি। নিজের ভালো-মন্দ, পছন্দ-অপছন্দের কথা জানাতেও অস্বস্তি হয়। আসলে আমার কী ভালো লাগল, কী লাগল না... কেউ জানতেও চায় না। তাও, চেষ্টা করি পজিটিভ থাকতে...
কিন্তু এই চুপচাপ থাকলে... একা বসে থাকলে... অপেক্ষা করতে করতে -- সাত-পাঁচ বিরক্তি আর ডিপ্রেশনগুলো ঝিঁঝিঁ ডাক শুরু করে দেয়।
কেসটা হত না... ওরা ঝামেলাটাকে এমন লেভেলে নিয়ে গেল যে হাতের বাইরে চলে গেল ব্যাপারটা। দাদার কাছেও ঝাড় খেলাম। ভুল কিছু বলেনি -- সত্যিই অনেক জায়গাতে অসুবিধে হচ্ছে, মাথা গরম করে কাজ হবে না। পার্টির বদনাম হবে। এটাই লিখে দেবে বড় করে... পার্টির নাম নিয়ে বলবে, ছেলে গিয়ে নার্সিংহোমে ভাঙচুর করেছে। যা হয়নি, তাও 'হয়েছে' করে দেবে। আমার উচিৎ ছিল পুরো জিনিসটার চুপচাপ ভিডিও করে বাজারে ছেড়ে দেওয়ার... দেখুক সবাই হারামিগুলো ঠিক কী করছে। প্রেগনেন্ট মহিলা, বাচ্চা নড়ছে না, সিরিয়াস কন্ডিশন... তার আলট্রা সাউন্ড করবে না, অ্যাডমিট করবে না... খানকীর ছেলে! বলে এখানে হবে না... ওখানে যান। রেখেছে কেন নার্সিং হোম তাহলে? সব আছে... সব হয়... টাইম বুঝে ভাঁজ মারা স্টার্ট হয় এদের।
সত্যি-ই বেকার গায়ে হাত তুলতে গেলাম, আমাদেরই ভিডিও করে নিতে পারত। থানাতেও নিয়ে গেল, দাদাও ঝাড় দিল। যে ছেলেগুলো যায়নি তারা মিচকেমি করবে এখন দাদার সামনে... নিজেদের লাইন ক্লিয়ার করবে। অথচ দরকারের সময়ে এদের টিকি দেখা যায় না... সেই আমাকেই ডাকে। আমার কোনো কাজ নেই... সব সময়ে ফ্রি... ফোকট।
এখানে বসে মোবাইলের দিকে তাকিয়ে থাকতে মনটা খুঁৎ খুঁৎ করে... অথচ এখনো মিনিট দশেক বাকি। আর মোবাইলে বার বার হাত দেওয়াও ঠিক না। এমনিতেই ভালো করে সাবান মেখে চান করতে হবে। চানটা কোথায় করা যায়, সেটাই ভাবছি... ঘরে যাব না এখান থেকে। বাবা-মা দুজনেরই বয়স হয়েছে।
পাড়ার ছেলে, একসাথে খেলতাম। দেখলে চিনতে পারে না... কিন্তু দরকারের সময়ে আর কাউকে পায়নি। সবাই 'স্যাড রিয়্যাক্ট' দিয়ে কেটে পড়েছে। মামা-মেসো কেউ আসেনি। তিন-চার জনকে জুটিয়ে টেম্পোর ব্যবস্থা করে এলাম। পাড়ায় নাম-ই হয়েছে 'শ্মশানবন্ধু'। দাদাও বলে সসানবন্ধু ঘোস। একটু 'স' এর দোষ আছে দাদার... সে থাক। এখানে লোকজনের সঙ্গে চেনাজানা হয়ে গেছে আসা-যাওয়া করতে করতে। সবাই মুখ চেনে। অমুকদা, তমুক ভাই বলে ডাকি... রাতের দিকে এলে একসাথে মাল টানি, তামাক খাই। বডি ছাড়া তো কেউ এদিকে আসে না খুব একটা। আমি আসি... ঘাটের দিকে গিয়ে বসি... কথা হয়। একটা টান জন্মে গেছে। আজও বলল 'মাস্ক পরা তো কী হয়েছে... দেখেই বুঝে গেছি... সসানবোন্দু!'।
বডি ভেতরে ঠেলে দেওয়ার পর থেকেই ছেলেটা চুপচাপ এক কোণে বসে আছে, থাকুক। আমার অত কাঁধে-পিঠে হাত দিয়ে সান্ত্বনা দেওয়া আসে না। সঙ্গে ছোটো শালা এসেছে, সে বুঝুক। অন্য সময় হলে অনেকে খাওয়া-দাওয়া সেড়ে নেয় এই ফাঁকে। এ বোধহয় সেসব করবে না, কাপড়-আসন কিছু কিনতেও যাচ্ছে না এরা। টাকা-ফাকা দিতে এলে নিয়ে নেবো। টেম্পোর খরচ আছে... আমরাও কেউ মাগনা নই। সব কিছুর সার্ভিস চার্জ থাকে। এমনিতেও কাজ মিটে গেলে আর কাল থেকে পাত্তা দেবে না।
এসব মিটিয়ে, অস্থি ভাসিয়ে ঘরে ফেরা... এখনো ঘন্টা খানেকের ব্যাপার। তারপর একবার খোঁজ নিতে হবে সেই বউটার কী হল... পরে তো আর কেউ নিজে থেকে জানায় না, আমারই দায়। বাচ্চাটা নড়ছিল না... খালি এটাই মনে পড়ছে। বার বার এক কথা মনে পড়লে অস্বস্তি হয়।
বর ওর জন্য চিলি-চিকেন বানিয়েছে... পাঁচটা লাল হার্ট আর চুমু দিয়ে পোস্ট করেছিল সংযুক্তা।
কাল অনেক রাতে দেখলাম... ঘুম আসছিল না। এর থেকে অনেক ভালো রান্না জানি... অনেককে রেঁধে খাইয়েছি।
সংযুক্তাও সাত মাসের প্রেগন্যান্ট, বোধহয় পেটের ভেতর বাচ্চাটার নড়াচড়াও এখন বুঝতে পারে।
অস্বস্তি হয়... বার বার এক কথা মনে পড়লে।
কাফন
ইন্দ্রনীল ঘোষ
মুহাম্মদ কুতুবুদ্দিন তাপাদার। আপাতত সদর দরজার সামনে ফ্যালফ্যালে দৃষ্টি, কাঁপা হাত, ঘন আচ্ছন্নতায় নিবিড় — কোটি আলোকবর্ষের আঁক কষছে। একটা সূর্য, দুটো বেগম, চারটে শিম্পাঞ্জী, খানকতক সেফটিপিন… ও, আরেকটা পাউডার কেস — ইতস্তত আঙুলে কড় গোনে কুতুবুদ্দিন।
মুহাম্মদ কুতুবুদ্দিন তাপাদার। তার নামের মতোই জগদ্দল এক বিশাল প্রাসাদের সদর দরজায় দাঁড়িয়ে। প্রাসাদ বলা ভুল, বরং প্রাসাদের খসড়া — কোনো অতিকায় উপন্যাসে, পাতার পর পাতা প্রায় সমস্ত শব্দই কেটে দিলে যা প’ড়ে থাকে — এ-ও তাই। দীর্ঘ বছর ধ’রে, সময় এই প্রাসাদকে এডিট করতে করতে তার অস্তিত্বের প্রায় সবটাই কেটে দিয়েছে — ইঁট কেটে বসিয়েছে পাখির বাসা, জানলা কেটে বসিয়েছে উঁইয়ের ঢিপি, খিলান কেটে মাকড়সার জাল…
মুহাম্মদ কুতুবুদ্দিন তাপাদার। এই নাম বা এই বিশাল প্রাসাদ কারোর গঠনের সাথেই মিল না খাওয়া এক খর্বাকায় ক্ষীণ ন্যুব্জ গঠনের বৃদ্ধ যেন এদের নিচে চাপা প’ড়ে আছে। সদর দরজার সামনে কোটি আলোকবর্ষের আঁক কষতে কষতে — ঘড়ির নেপথ্যে, দুপুর একটা কিম্বা ভোর পাঁচটা বা বিকেল সাড়ে ছয়।
কুতুবুদ্দিনের কোনো কাজ নেই — এই বিশাল প্রাসাদের কঙ্কালে, এই বিশ্বে… কোথাও নেই। অথচ কোন একটা বেশ কাজ তার করার কথা ছিল —কুতুবুদ্দিন টের পায় — কিন্তু কী কাজ? সারাক্ষণ তার মনের মধ্যে কোন একটা ভুলে-যাওয়া কাজ যেন আটকে আছে, দেখা যায় না কী কাজ, অথচ আছে… তাকেই দেখার চেষ্টা ক’রে চলে কুতুবুদ্দিন। বাইরে থেকে মনে হয়, এই চেষ্টাটাই যেন তার কাজ।
সদর দরজায় দাঁড়িয়ে কড় গুণে গুণে সেটাই সে করছিল। যতদূর মনে পড়ে বেগম সাহেবা তাকে একটা গায়ে-মাখা পাউডার আনতে ব’লে গুহায় ফিরে গেলেন, হিড়িম আর টিরিম দল নিয়ে শিকার থেকে ফিরেছে, বন শুয়োরের সাথে আজ কিছু হরিণও। আজ বর্ষা, বহু যুগ পর পেখম ফিরেছে ময়ূরে। বেগম সাহেবার ইচ্ছা রাতে মহুয়া খেয়ে উলোল হবে হিড়িমের সাথে। বৃষ্টি এলেই প্রাসাদের সমস্ত জানলা দিয়ে কোন দূর পাউডারের গন্ধ পায় কুতুবুদ্দিন। কিন্তু এখন সে পাউডার জোগাড় করবে কোত্থেকে? বেগম সাহেবা কী আদপেও তেমন কিছু বলেছিলেন? না কী নবাব সিরাজের সামনে দোলনায় দুলতে দুলতে বিস্কুট খাচ্ছিলেন? কুতুবুদ্দিনকে ডেকে বলে উঠলেন, “যা তো কুতুব, খানকতক সেফটিপিন নিয়ে আয়, শাড়িটা গোছনা ক’রে পরি”। নবাবের পাশে জানলা দিয়ে তখন উত্তর-পশ্চিমের গঙ্গা, সন্ধে-শেষ আলোয় জড়িয়ে যাচ্ছে নদীর হাওয়া। সেদিনও এমনই এক দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল কুতুবুদ্দিন। দরজাটা বারবার খুলে যাওয়ার শব্দ করছিল, বন্ধ হওয়ার শব্দ — সেদিনই প্রথম অবাক হয়ে শোনা, দু’টো শব্দ কী অদ্ভুত আলাদা! বেগম মাঝেমধ্যেই বলে, “দরজা তোকে ডাকে কুতুব, তোর সাথে আলাপ করে…”। সেদিনও কি এমনই এক দরজা ছিল? সন্ধে-শেষ আলোয় জড়িয়ে যাচ্ছিল নদীর হাওয়া? না-কী সে অন্য কোনোখানের কথা? অন্য কোনো নদীর? সময়ের অনেক গভীরে যে সময়… খাদের গভীরে যে খাদ, তার গভীরে নদী। খাদের ওপর ঝুঁকে আছে ঘন জঙ্গল। তারা কেউই তখনও আজকের মতো মানুষ হয়ে ওঠেনি, তবু বেগমের সেদিনের চোখও বেগমেরই চোখ, আদেশ দেওয়ার কায়দাটাও হুবহু… হাত থেকে একটা-কী ফল প’ড়ে গেল বেগমের, খাদের দিকে, আর সাথে সাথেই আদেশ পেল কুতুবুদ্দিন। খাদ বরাবর অনেকটা নেমে এসেও — আরেকটু নিচেই নদী — ফলটা পায়নি কুতুবুদ্দিন। সেই ফলই কী তবে খুঁজে বার করতে বলল, বেগম?
কুতুবুদ্দিনের অস্থিরতা বাড়ে। সে পায়চারি করতে থাকে, একবার ভিতরদিকে যায়, একবার দরজার দিকে ফেরে। কাজটা কিছুতেই তার মনে পড়ছে না। নেপথ্যে, ঘড়িতে, মাকড়সার জালের মধ্যে একটু জায়গা ক’রে নিয়ে দুলে চলেছে পেন্ডুলাম। কুতুবুদ্দিনও ওই পেন্ডুলামের মতো ভেসে ভেসে দোলার চেষ্টা করে। পেন্ডুলাম সেজে কতক্ষণ কতকাল সে এভাবে দুলে চলেছে। অথচ কিছুতেই মনে পড়ছে না, তার নিজের কাজটা ঠিক কী? ইঁট কেটে বসানো পাখির বাসার দিকে, জানলা কেটে বসানো উঁইয়ের ঢিপির দিকে, খিলান কাটা মাকড়সার জালের দিকে চীৎকার ক’রে সে জিজ্ঞেস করে, “তোমাদের কাজ কী?”
— কোন কাজ যে সত্যি থাকতেই হবে, একথা তোমায় কে বলেছে?
— আছে। নিশ্চয় আছে। একটা কী কাজ আমায় বেগম সাহেবা দিল। কিন্তু কিছুতেই মনে পড়ছে না। কিছুতেই না। আমি ভেস্তে যাচ্ছি, পেন্ডুলাম — এভাবে কাজহীন, আমি যে ভেস্তে যাচ্ছি।
আকাশ দেখলেই ইদানীং পাখি জন্মানোর গর্ত মনে হয়
একটা আকাশে কত যুগ-যুগ পাখিদের ডাক জমা থাকে—
তাদের কাজ মূলত কী?
কোনও কাজ যে সত্যি থাকতেই হবে, একথা আমায় কে বলেছে?
এভাবেই আমার অসহয়তা শুরু —
নিজেকে বিট্রে করা দিয়ে, আমি ডানায় পৃথিবী মাখি
গালে মাখি ভারতবর্ষ
আর রাজ্য জেলা বাকি যা কিছু সেগুলোর তাপ্পি দিই পরনে
আমার সহনশীল আদিগন্ত শরীর,
মানুষের বিশ্বস্ত মনে হয়…
তাকে কারা খাবার দিতে আসে প্রতিদিন। দল বেঁধে। পোঁটলায় রুটি ভাত তরকারি বেঁধে। কুতুব তাদের চেনে না। তারা কুতুবুদ্দিনের দিকে আঙুল দেখিয়ে কী সব হাসে, বলে… কুতুব তার কিছুই বোঝে না। শুধু কোথায় যেন শুনেছে, ওরা কুতুবের আদি গ্রাম থেকে আসে। অনেক দূর সেই শ্রীহট্ট থেকে। যেখানে কুতুব ছিল জমির মালিক — তাপাদার। তার ওপর ছিল মিরাশদার, তার ওপর জমিদার। বেগমের ওপর বেগম, তার ওপর আরও বেগম… কত আলো এই পৃথিবীতে। শুধু একটাও কাজ নেই কুতুবের। অথচ থাকার কথা ছিল, কিন্তু কী কাজ? ধূ-ধূ আলোর মধ্যে উন্মাদের মতো এই খুঁজে বেড়ায় সে...
ভীষণ অসহায় লাগে কুতুবের। কান্না পায়। চীৎকার করে, অথচ আওয়াজ বেরোয় না। খাবার দিতে আসা মানুষগুলোকে যদি এই মুহূর্তে পেত, না হয় তাদেরই জিজ্ঞেস করত কুতুবুদ্দিন। কিন্তু কেউ তো আসে না। কুতুবুদ্দিন ভেস্তে যাচ্ছে। ক্রমশ। এভাবে কাজহীন ভেস্তে যাচ্ছে তার অস্তিত্ব। চামড়ায় নখের আঁচড় কাটে দিয়ে কুতুবুদ্দিন, নিজেকে প্রমাণ করতে চায়, ভীষণভাবে কাদার মধ্যে গড়াগড়ি খেতে চায়, সত্যি হয়ে উঠতে চায়।
আমাকে একটা কাজ দাও, যে কোন, যেমন তেমন একটা কাজ
মাইরি-মেরী করে বলছি
একটা কাজ দাও
এই নিত্যিদিনের বানভাসি আর ভাল লাগছেনা।
বেসিমার চুল্লিতে দুহাতে করে আমি লোহার ক্কাথ ছেঁকে দেবো
আমি ঝুড়িতে চন্দন নেবার মতো করে টানবো স্ল্যাগ
আমাকে একটা ন’শো পাউন্ডের বৈদ্যুতিক হাতুড়ি করে নিও
যা দিয়ে জ্বলন্ত ইনগটগুলো ছু’ বলতে ঊরুর নীচে পেড়ে ফেলা যায়।
তা নইলে কী করবো বুকের এই ন’লক্ষ কিলোওয়াট
জলবিদ্যুৎ নিয়ে
শেষে কি জ্বালাবো তোমাদের সাজানো বাগান,
টেরিন, মেহগিনি, ফুলবাড়ি
আমি কি শেষ পর্যন্ত জ্বলতে জ্বলতে দু’চোখের চামড়া খুইয়ে
তোমাদের অন্দরে ঢুকে পড়বো?
মুহাম্মদ কুতুবুদ্দিন তাপাদার। আপাতত, সদরের সামনে কাদায় গড়াগড়ি খাচ্ছে, মাটি তুলে মুখে মাখছে, নিজের গায়ে নখ আঁচড়াচ্ছে। বেগম আসেনি। তার বলা কাজটা শুধু মনের মধ্যে এক খোঁজ হয়ে আটকেই থাকে। খাবার দিতে আসা শ্রীহট্টের মানুষগুলোও আসেনি।
মুহাম্মদ কুতুবুদ্দিন তাপাদার। যে জানত, দরজা বন্ধ আর খোলার শব্দ আলাদা। হাওয়ায় সদর দরজা ওলট-পালট হচ্ছে, কুতুবুদ্দিনের কান খাড়া হয়। দরজা কি তাকে তার কাজের কথা বলবে?
মুহাম্মদ কুতুবুদ্দিন তাপাদার। বাইরে থেকে এই ক্ষীণ খর্বাকায় মানুষটি সমেত এই প্রাসাদের কঙ্কালকে আমরা একটা কবর ভাবতে পারি। দরজা নড়া বা মানুষজনের খাবার দিতে আসাকে ভাবতে পারি, কবরের ওপর ঝ’রে পড়া ফুল, শুকনো পাতা। আর কুতুবুদ্দিন সেই মৃতদেহ, যে দাফনের পরেও ভেবে চলেছে, “তার কাজটা ঠিক কী ছিল?”
[প্রথম কবিতা “বোঝাপড়া” লেখকের কাব্যগ্রন্থ “হারাবার সময় পরনে ছিল” থেকে ও দ্বিতীয় কবিতা “শেষ পর্যন্ত” কবি স্বদেশ সেনের কাব্যগ্রন্থ “রাখা হয়েছে কমলালেবু” থেকে নেওয়া।]














Comments
Post a Comment